ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপের বিস্ময় কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপের বিস্ময় কেপ ভার্দে
×

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১১:২০

আয়তনে চার হাজার বর্গকিলোমিটারের একটু বেশি। জনসংখ্যাও ছয় লাখের আশপাশে। বিশ্ব মানচিত্রে ছোট এক দেশ। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের গল্পে যার বিস্ময়কর উপস্থিতির কথা জানত সবাই। সেই কেপ ভার্দে ফুটবল মহাযজ্ঞে লিখেছে নতুন উপাখ্যান। জন্ম দিয়েছে রূপকথার। বিশ্বকাপ ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নক আউট পর্বে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের বিস্ময়ের নাম এখন আফ্রিকান দেশটি। বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়েই খুলে যায় স্বপ্নের দুয়ার। গ্রুপের অন্য ম্যাচে স্পেনের কাছে উরুগুয়ের পরাজয়ে মিলে যায় সমীকরণ। টানা তিন ড্রয়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এইচ’-এ দ্বিতীয় হয়ে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে; যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।

ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপের টিকিট কাটে কেপ ভার্দে। গোলরক্ষক ভোজিনহার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে বিশ্ব আসরের প্রথম ম্যাচে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিয়ে স্বপ্নিল যাত্রা শুরু হয় দেশটির। দ্বিতীয় ম্যাচে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গে করে ২-২ গোলে ড্র। আর শনিবার রুখে দেয় এশিয়ার শক্তি সৌদি আরবকে। নিজেদের কাজটি সারার পর কেপ ভার্দের এক সাপোর্টিং স্টাফ মাঠে নিয়ে আসেন মোবাইল। স্ক্রিনে সবার দৃষ্টি চলে যায় স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের দিকে। সেই ম্যাচটি ড্র হওয়ার পর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট এই দেশের ফুটবলাররা। পরস্পরকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে, লাফিয়ে, নেচে উদযাপন করলেন তারা। দেশের পতাকা হাতে নিয়ে সবুজগালিচায় শিষ্যদের নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো।

বুবিস্তা নামে পরিচিত কোপ ভার্দে কোচ পতাকা হাতে করে যান ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনেও। রূপকথার মতো এই সাফল্য রাতারাতি ও আচমকা ধরা দেয়নি। বরং কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং চাপের মুখে ভেঙে না পড়ার দৃঢ় সংকল্পের ওপর ভিত্তি করেই অর্জিত হয়েছে বলে জানান ব্রিতো, ‘তারা যা অর্জন করেছে, তাতে আমি গর্বিত। একটি ম্যাচও না হেরে প্রথম পর্ব শেষ করতে পারায় আমাদের উচ্ছ্বসিত হতেই হবে। এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং দলীয় চেতনা। আমাদের সমর্থকদের এই সব কিছুই প্রাপ্য। আরও ভালো কিছু করতে, আরও আনন্দ করার জন্য স্রেফ একটি গোল দূরে ছিলাম আমরা। জেতার জন্য ছেলেরা তাদের সাধ্যমতো সবকিছু করেছে। আমি সন্তুষ্ট।’

যা অর্জন করেছেন তাতে নিজেরাও যে চমকে গেছেন তা ফুটে উঠেছে বুবিস্তার কণ্ঠে। একই সঙ্গে সাফল্যের জন্য নিজেদের প্রতিজ্ঞার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি, ‘একটু অবাক করার মতোই ব্যাপার। যদিও প্রথম দুটি ম্যাচের পর আমরা মনে মনে ভাবছিলাম, এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারব। ছেলেরা আসলে সারা বিশ্বকে দেখাতে মরিয়া ছিল যে, আমরা কী দিয়ে তৈরি। আগেই যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমরা দারুণ গর্বিত ছিলাম। খুবই ছোট একটি দেশ আমরা। তবে যা অর্জন করতে চাই, তার জন্য লড়াই করি। আমাদের জন্য কিছুই অসম্ভব নয়।’

অথচ গ্রুপ ‘এইচ’-এ সম্ভাব্য রানার্সআপ হিসেবে উরুগুয়েকেই ধরে নিয়েছিলেন ফুটবলবোদ্ধারা। সৌদি আরবের সম্ভাবনাও দেখছিলেন কেউ কেউ। কোনো সমীকরণে না রাখা কেপ ভার্দেই কিনা বদলে দিয়েছে সব ছক। এই দেশটির ফুটবল চলে প্রবাসীদের দিয়ে। নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারদের দিয়ে গড়া কেপ ভার্দে জাতীয় দল। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যার চেয়েও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা বেশি। সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় ফুটবল দলেও। ঘরোয়া লিগে ১২টি ক্লাব আছে। কিন্তু স্থানীয় লিগের একজন খেলোয়াড়ও নেই জাতীয় দলে। ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের লিগে খেলা ফুটবলারদের কল্যাণেই এখন ইতিহাসের পাতায় কেপ ভার্দে।

হিউস্টনে গতকাল ম্যাচের পর বেশির ভাগ সমর্থক যখন মাঠ ছেড়ে চলে যান, তখনও সবুজগালিচায় বসে থাকেন কেপ ভার্দের কয়েকজন ফুটবলার। দেশের জন্য স্মরণীয় মুহূর্তটি ধরে রাখতে তাদের কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ বা গায়ে পতাকা জড়াচ্ছিলেন। ফুটবলে নিজ দেশের ঐতিহাসিক মুহূর্তটি স্মৃতির ক্যানভাসে ধরে রাখার চেষ্টায় ভোজিনহোরা।

আরও পড়ুন

×