দুই ফরাসি ‘রাফাল’ এমবাপ্পে-দেম্বেলে
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, হিউস্টন থেকে
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ১১:৩১
ভাবুন তো, যদি কফির ধোঁয়া ওঠা কোনো আড্ডায় বসে কেউ হঠাৎ বলে বসেন, ফুটবল মাঠেও যুদ্ধবিমান ওড়ে। তবে একেক মহাদেশের ফুটবল-পাগলদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে? আমেরিকায় এসে যা বুঝলাম, তাতে কোনো খাঁটি মার্কিন হলে হয়তো চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলবেন, ‘ওটা তো সকার, সুপারসনিক ফাইটার জেটের ডগফাইট হয় আমাদের এনএফএলে।’
একজন ইউরোপিয়ান হয়তো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জুড়বেন, ‘ট্যাকটিক্যাল স্পেস আর উইং-প্লে ছাড়া গতি তো স্রেফ অপচয়।’ আর কোনো লাতিন? তিনি নিশ্চিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, ‘ফুটবল তো আসলে পায়ের ছন্দে কবিতা বোনা, সেখানে বোমাবর্ষণের মতো যুদ্ধবিমান আবার আসবে কেন?’
কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে এসে দুজনেই প্রতি ম্যাচে যা করছেন, তা তাদের যুদ্ধবিমান ‘রাফাল’-এর মতোই বিধ্বংসী। আজ রাতে নিউইয়র্কের মেটলাইফেও বুঝি তার ব্যতিক্রম হবে না। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলে– গতি যাদের মজ্জায়, ক্ষিপ্রতা যাদের স্বভাবে আর প্রতিপক্ষের বক্সে বোমাবর্ষণ যাদের রোজকার রুটিন– তাদের রুখবে কে? ডান উইং দিয়ে দেম্বেলের ওই চাবুকের মতো ড্রিবলিং আর সেন্ট্রাল পজিশনে এমবাপ্পের সেই ফিনিশিংয়ের ভেতরের বিষ– ফুটবলের এ দুই রাজপুত্র আজ শেষ ষোলোর টিকিট কাটার ম্যাচে এক ফুঁয়ে ধসিয়ে দিতে পারেন নর্ডিক প্রাচীরের নীল-হলুদ অহংকার।
হিউস্টনে ফিফার মিডিয়া সেন্টারে বসে ফরাসি শিবিরের খবর যা, তা হলো দিদিয়ের দেশম মাতৃশোক কাটিয়ে দেশ থেকে ফিরেছেন। আজকের ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে তিনিই রণকৌশল সাজাবেন, যেখানে ব্লু-প্রিন্টটাই হলো মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দুই উইংয়ে পাস বাড়িয়ে দেওয়া। যেখানে উসমান দেম্বেলে ডান প্রান্তে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে বক্সে বল কাটবেন আর সেন্ট্রাল স্পেস ব্যবহার করে এমবাপ্পে গোলপোস্ট ফালাফালা করে দেবেন। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই তিনটির বেশি করে গোল দিয়েছে ফ্রান্স। সেনেগাল, ইরাক আর নরওয়ের বিপক্ষে ১০ গোলের বিনিময়ে হজম দুটিতে, যার আটটিই আবার এসেছে দুই ‘রাফাল’ এমবাপ্পে আর দেম্বেলের থেকে। বাকি দুটি ব্রাডলি বারকোলা আর দেজিরে দুয়ের। এবং তাদেরও জেট ফুয়েল সাপ্লাই করেছে সেই দুই রাফাল।
কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের চারটি গোল যেভাবে ভাগ করেছেন, তা এককথায় ক্ল্যাসিক। সেনেগালের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই চিতার ক্ষিপ্রতায় দুটি গোল করে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন কিংবদন্তি জুস্ত ফন্তেইনকে। এরপর ইরাকের বিরুদ্ধে সেই বজ্রবিদ্যুৎ আর ঝড়ের রাতেও তাদের রক্ষণ ফালাফালা করে আরও একটি রাজকীয় ব্রেস বা জোড়া গোল উপহার দিলেন। এমবাপ্পের গোলগুলো আসলে স্রেফ গোল নয়; ওগুলো প্রতিপক্ষের বক্সে তাঁর একক আধিপত্যের একেকটি সই। সেই সঙ্গে মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস! আর্জেন্টাইন গোট (গ্রেটেস্ট অব অলটাইম) মেসি যেখানে ছয় বিশ্বকাপে ১৯ গোল নিয়ে শেষ অধ্যায়ের দিকে, সেখানে এমবাপ্পের তিনটি বিশ্বকাপেই ১৬ গোল করে দ্বিতীয়তে।
আজকের ম্যাচেও তাঁর সুযোগ রয়েছে মেসির সঙ্গে ব্যবধানটা কমিয়ে ফেলার। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যেমন-তেমন হলেও ফ্রান্সের হয়ে শিরোপাটা তাঁর মুকুটের মণি। সেখানেই তিনি দারুণ এক সতীর্থ পেয়েছেন দেম্বেলেকে, যিনি কিনা নিজেকে চিনিয়েছেন গ্রুপ পর্বের শেষ ভাগে এসে। ইরাকের বিপক্ষে একটি ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে টুর্নামেন্টে গোলের খাতা খোলার পর নরওয়ের বিপক্ষে ডানা মেলেছে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা রাত। মাত্র ৩২ মিনিটের এক অবিশ্বাস্য টর্নেডোতে ডান পা আর বাঁ পায়ের নিখুঁত জাদুতে করলেন বিশ্বরেকর্ড গড়া এক হ্যাটট্রিক। মজার ব্যাপার হলো, দেম্বেলের ওই হ্যাটট্রিকের প্রথম দুটি গোলের জোগানদার ছিলেন কিন্তু এমবাপ্পে!
তবে আজ এই দুই ‘ফরাসি রাফাল’ ঠেকানোর জন্য কিছু মিসাইল ঠিক করে রাখতে পারেন সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটার। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে ফ্রান্সের দুই ‘রাফাল’কে খোলা মাঠ বা কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য ফাঁকা জায়গা দিলে আত্মহত্যা করা হবে। তাই অতি-রক্ষণাত্মক ‘লো-ব্লক’ বা ‘বাস পার্কিং’ স্ট্র্যাটেজি নিয়ে খেলতে পারে, যেখানে দেম্বেলের উইং থেকে ভেতরে ঢোকার করিডোরগুলো তারা তিন-চারজন ডিফেন্ডার দিয়ে জ্যাম করে রাখার চেষ্টা করতেই পারে। মিডফিল্ডে জেসপার কার্লস্ট্রোম বা লুকাস বার্গভালের মতো প্রতিভাদের দিয়ে ফ্রান্সের বল সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়ার ছক কষতে পারে। বল যদি এমবাপ্পে-দেম্বেলের পায়ে পৌঁছানোর আগেই মাঝমাঠে আটকে যায়, তবে ফরাসি গতির ধার এমনিতেই কমে আসবে।
সুইডেনের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ভিক্টর লিন্ডেলফ (অ্যাস্টন ভিলা) ও ইসাক হিয়েনদের (আটালান্টা) নিয়ে গড়া রক্ষণভাগ অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কড়া ট্যাকলিংয়ের জন্য বিখ্যাত। এমবাপ্পের ওয়ান-টু-ওয়ান গতির মুখে তারা শরীরী ফুটবল বা ‘ফিজিক্যাল প্লে’ দিয়ে স্পেস বন্ধ করার চেষ্টা করবেই করবে। তবে কিনা দিনশেষে একটা কথা তো মানতেই হবে– রাফাল তো আসলে রাফালই! সুপারসনিক তার গতি আর আধুনিক যুদ্ধবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে সে এমন এক অদৃশ্য প্রযুক্তি, যা সাধারণ কোনো রাডারে ধরা পড়ে না।
