ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

এক বুক অভিমান নিয়ে বিদায় মডরিচের

এক বুক অভিমান নিয়ে বিদায় মডরিচের
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১২

বলকানের রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকায় যুগে যুগে এমন কিছু ক্রোয়াট যোদ্ধার জন্ম হয়েছে, যারা তরবারি দিয়ে নয়, নিজেদের বুকের রক্ত আর ইস্পাতকঠিন জেদ দিয়ে ইতিহাস লিখেছেন। সেই আদিম যোদ্ধারা শত্রুর বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েও শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই করতেন, অথচ দিন শেষে যুদ্ধ জয়ের সব গৌরব আর রাজমুকুট অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যেত। ইতিহাস তাদের মনে রেখেছে চিরকালীন ‘ট্র্যাজিক হিরো’ বা বিষণ্ন বিজয়ী হিসেবে। ফুটবল ইতিহাসও হয়তো চিরকাল তেমনই এই অদম্য ক্রোয়াটযোদ্ধা লুকা মডরিচকে মনে রাখবে এক বিষণ্ন মহানায়ক হিসেবে। পাঁচটি বিশ্বকাপের দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথে যিনি একবার দলকে নিয়ে গিয়েছেন ফাইনালের আঙিনায়, দু-দুবার খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়েছেন সেমিফাইনালের মঞ্চে–অথচ দিন শেষে ওই সোনালি ট্রফি স্পর্শ করার সৌভাগ্য তাঁর হলো না। বিশ্বকাপে বিদায়টা হলো বুকভরা অভিমান নিয়ে।

পর্তুগালের বিপক্ষে নিষ্ঠুর নিয়তি এক মহাতারকার বিদায়লগ্নে রাজমুকুট নয়, উপহার দিল বুকভরা অভিমান। ২-১ গোলে হেরে ম্যাচ শেষে মডরিচের শূন্য দৃষ্টি ও ক্লান্ত হাসি বুঝিয়ে দিল, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জাদুকরি অধ্যায়টি শেষ হলো চোখের জলে। ভিএআর নাটকে শেষ গোল বাতিল হওয়ার বিষাদ আর বন্ধু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বুকে মাথা রেখে বিদায়ের দীর্ঘ আলিঙ্গন–ট্র্যাজেডির এক মহানায়ক হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলের চেনা আঙিনা ছেড়ে গেলেন ক্রোয়েশিয়ার এই সোনালি প্রজন্মের কাণ্ডারি। ফুটবল দেবতা আর কতটা নির্মম হলে এমন এক জাদুকরের কপালে আজন্মের এই অপূর্ণতার ট্র্যাজেডি লিখে রাখেন–তা জানা নেই।

অভিযানটা তাঁর শুরু হয়েছিল আজ থেকে ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনা বনাম ক্রোয়েশিয়ার একটি প্রীতি ম্যাচে মাত্র ২০ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটেছিল রোগাপটকা, উশকোখুশকো চুলের এক তরুণের। সেবার বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে নিজের প্রথম বিশ্বকাপের স্বাদ পেয়েছিলেন লুকা। তখন কে জানত, বলকানের যুদ্ধবিধ্বস্ত এক শরণার্থী শিবির থেকে উঠে আসা এই ছেলেই একদিন বিশ্ব ফুটবলের কিংবন্তি হয়ে উঠবেন? ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে এর আগে ডাভর সুকারের মতো বিশ্বমানের স্ট্রাইকার এসেছেন, কিন্তু একটা আস্ত সোনালি প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহসটা লুকা মডরিচই এনে দিয়েছিলেন। ইভান রাকিটিচ, মারিও মাঞ্জুকিচ, ইভান পেরিসিচদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অপরাজেয় ক্রোয়াট দুর্গ, যাদের একমাত্র মূলমন্ত্র ছিল– কখনও হাল না ছাড়া।

মডরিচের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বুকভাঙা অধ্যায় ছিল ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ। একের পর এক অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচ আর টাইব্রেকারের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে ইতিহাসের প্রথমবার ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন এই ছোট্ট জাদুকর। কিন্তু ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ৪-২ গোলে হেরে যখন স্বপ্নভঙ্গ হলো, তখন লুকার সেই বিষণ্ন মুখ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক দলিল হয়ে রইল। সেদিন সোনালি ট্রফিটা ছোঁয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর হাতেই উঠেছিল ‘গোল্ডেন বল’। এর ঠিক চার বছর পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও সবাই ভেবেছিল বুড়ো ক্রোয়েশিয়া দ্রুতই বিদায় নেবে। কিন্তু ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে কোয়ার্টার ফাইনালে স্তব্ধ করে দিয়ে দলকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জপদক (তৃতীয় স্থান) এনে দিয়েছিলেন মডরিচই। অথচ এত সাফল্যের মাঝেও ফুটবলের পরম আরাধ্য সেই ট্রফিটি স্পর্শ করতে না পারার এক আজন্ম অভিমান তাঁর ড্রেসিংরুমের সঙ্গী হয়েই রয়ে গেল।

ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে দেশের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ ২০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। মাঝমাঠের জেনারেল হয়েও দেশের জন্য অবদান রেখেছেন ২৭টি দর্শনীয় গোল এবং অসংখ্য অ্যাসিস্টে। কিন্তু মডরিচকে কি কেবল সংখ্যার ফ্রেমে বাঁধা সম্ভব? তাঁর আসল কৃতিত্ব তো লুকিয়ে রয়েছে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতায়। ট্রাই-আউট কিংবা পাসিং রেট–সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্য। ২০১৮ সালে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক দশকের রাজত্ব ভেঙে তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ই প্রমাণ করে সমসাময়িক ফুটবলে তাঁর স্থান কতটা উঁচুতে।

কিন্তু এমন এক মহাকাব্যের শেষ পাতাটি কেন জানি বড্ড বেশি অম্লমধুর হয়ে রইল। ম্যাচ শেষের পর মিক্সড জোনে এসে লুকার কণ্ঠে ঝরে পড়ল প্রযুক্তির নির্মমতার বিরুদ্ধে এক তীব্র আগ্নেয়গিরি। ভিএআরের চুলচেরা সিদ্ধান্তে ১০৩ মিনিটের গোলটি বাতিল হওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ মডরিচ সরাসরি বলেন, ‘ওরা বলছে মাতানোভিচ নাকি বলে মাথা ছুঁইয়েছিল, কিন্তু আমরা ড্রেসিংরুমে বসে বারবার ফুটেজ দেখেছি। ও যে বল স্পর্শ করেছে– এমন কোনো প্রমাণ সেখানে নেই! ফুটবলে এমন বড় ম্যাচে এই ধরনের প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত সত্যিই বড্ড নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকারক।’ ম্যাচের প্রথমার্ধে নিজেদের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের দায় মেনে নিলেও দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্বিত ছিলেন অধিনায়ক। নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ক্লান্ত জাদুকর কেবল এক চিলতে মলিন হেসে বিদায় নেন। এক বুক অভিমান নিয়ে বিশ্বকাপের ক্যানভাসে নিজের শেষ রাগিণী শুনিয়ে যান লুকা।

আরও পড়ুন

×