ব্রাজিলের বিদায়, আশা আর্জেন্টিনায়
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৭
নেইমারের কান্নায় বিশ্বকাপের মায়াবী জ্যোৎস্নায় কি নিকষ অন্ধকার নেমে এলো? অবশ্যই তাই, বাংলাদেশের ফুটবলীয় আকাশে বিশ্বকাপের পূর্ণিমা কখনও কোনো একক আলোয় পূর্ণতা পায়নি। দেশের কোটি কোটি ফুটবল রোমান্টিকের হৃদয়ে সেই আলো তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ চাঁদ মিলে– যার অর্ধেকটা ব্রাজিল, আর বাকিটা আর্জেন্টিনায়। সেখানে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ একা নেইমারকে কাঁদিয়েই শান্ত করেনি; সুদূর পদ্মাপারের এক চিরন্তন আবেগের আকাশ থেকে একটা আস্ত চাঁদকে যেন টেনে খসিয়ে দিয়েছে। পেনাল্টি শুটআউটের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত আর কান্নাভেজা হলুদ জার্সি জড়িয়ে রিক্ত হিয়ায় নেইমারের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এই বিদায় বাঙালির কাছে কোনো সাধারণ পরাজয় নয়– এ যেন ভরা উৎসবের মাঝপথে এক মহানিঃশব্দ বিসর্জন।
বাকি বিশ্বকাপে হয়তো ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা মাঠ কাঁপাবে, অন্য হাজারো তারার মেলা বসবে আকাশে। কিন্তু সত্যি বলতে, মূল আকর্ষণের সেই চিরচেনা হলুদ আলোর অনুপস্থিতিতে বাঙালির কাছে এই বিশ্বকাপ এখন এক বিবর্ণ জোছনা রাত। ব্রাজিলের এই অশ্রুসজল প্রস্থানে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই টুর্নামেন্টটি এখন আর পূর্ণিমার মায়া ছড়াবে না, এটি পড়ে রইল কেবলই এক বিষণ্ন ও ‘আধখোয়া চাঁদ’ হয়ে!
রাগের সঙ্গে না হয় কিছুটা অনুরাগ ছিল, ভালোবাসার কারণে অভিমানও ছিল– তবু তো ছিল! ব্রাজিলের সেই আপনজনরা চোখের সামনেই ছিল। কিন্তু আজ? আজ যে এই কোটি ভক্তের নয়নের সম্মুখে আর ব্রাজিলই নেই বিশ্বকাপে! ব্রাজিলহীন এই বিশ্বকাপ এখন ঠিক যেন ডানা ভেঙে পড়ে থাকা এক ক্লান্ত চিল। হেক্সা জয়ের যে সোনালি তরী নিয়ে তারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল, হাডসন নদীর তীরে এসে নরওয়ের মতো ভাইকিন্সদের কাছে তা তলিয়ে গেল। শূন্যতার ক্যানভাসে রেখে গেল শুধুই এক বিষণ্ন রাজপুত্রের ‘এটাই হয়তো আমার শেষ ম্যাচ’ অসহায় উচ্চারণ– রিক্ত হিয়ায় নেইমার। যাঁর পায়ের শৈল্পিক ড্রিবলিং দেখার জন্য ফুটবল রোমান্টিকরা চোখ মেলে রাখত, আজ তাঁরই চোখের জলে ব্রাজিলের এই প্রস্থান বিশ্বজোড়া কোটি ভক্তের চোখকে করে দিল মেঘাতুর। এবারের বিশ্বকাপে চোখের সামনে থেকে চিরচেনা সেই হলুদ জার্সি হয়তো হারিয়ে গেল, কিন্তু রেখে গেল এক বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস আর এক অধরা মহাকাব্যের করুণতম ট্র্যাজেডি।
কিন্তু কেন এমন হলো? দলটি কি এতটাই খারাপ ছিল যে এক হালান্ডময় নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাবে? নকআউটে যে ব্রাজিল প্রতিপক্ষের স্নায়ুর পরীক্ষা নিয়ে এসেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে, তারাই কিনা নিজেরা ফাঁদে পড়ল নরওয়ের। পেলে-গারিঞ্চাদের যে সাম্বায় শতাব্দীর ঐতিহ্য বিশ্বের কাছে সমীহ আদায় করেছে, কোথায় গেল সেই সাম্বা? কোথায় গেল কোচ কার্লো আনচেলত্তির দাম্ভিকতা? পরের বিশ্বকাপ না আসা পর্যন্ত এই প্রশ্নগুলোই হাতুড়ির মতো বিদ্ধ করবে প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ান সমর্থকের মনে। আর একজনকে আজীবন তাড়া করে যাবে একটি পেনাল্টি মিসের যন্ত্রণা। ব্রুনো গিমারেস– কোচ আনচেলত্তি যাঁকে দলের প্রধান পেনাল্টি শুটার হিসেবে এগিয়ে দিয়েছিলেন, ভিনির হাত থেকে বল কেড়ে যাঁর পায়ে কোচিং স্টাফ বল তুলে দিতে বলেছিলেন; সেই ব্রুনোকে হতাশা, এই শূন্যতা, এই জ্বালা আজীবন তাড়া করবে। ঠিক যেভাবে জিকোকে এখনও তাড়া করে ’৮৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স ম্যাচে পেনাল্টি মিসের কথা।
নরওয়ের সামনে ব্রাজিলের ইউরোপিয়ান আতঙ্কটি বিশ্রীভাবে সামনে চলে এসেছিল ম্যাচের শুরুর দিকেই। ব্রাজিলের মিডফিল্ড বলে কোনো পদার্থ ছিল না। পাকেতা, রাফিনিয়ার বিকল্প আনচেলত্তি বের করতে পারেননি। পাসিং জঘন্য, বল পজেশনও তথৈবচ। বল পজেশনের হিসাবে নরওয়ে ৬৬.৫ শতাংশ, ব্রাজিল ৩৩.৫ শতাংশ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের কুৎসিততম পরিসংখ্যান। ফুটবল এখন সাহসীদের হয়ে গেছে, শিল্পের সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা ও নাছোড় মনোভাব দরকার। মেক্সিকোয় গিয়ে ভয়ংকর চাপের মধ্যে মেক্সিকোকে ১০ জনে হারিয়ে সেটাই করে দেখাল ইংল্যান্ড। এই ব্রাজিল সেটিও করতে পারত না। ব্রাজিলের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কাঠগড়ায় কার্লো আনচেলত্তি। যেখানে রোমারিও, রোনাল্ডো, কাকা, রোনালদিনহোর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তাহলে তোমরা কেন এগিয়ে আসো না কোচিং করাতে?
ব্রাজিলের এই পতন তো হঠাৎ না, ২০০২ বিশ্বকাপের পর থেকে ‘হেক্সা হেক্সা’ করে আসছে তারা। অথচ ভালো কোনো কোচই আসছে না দলটিকে সামলাতে। ব্রাজিলের এই সাবেক ফুটবলাররা ফিফার আমন্ত্রণে প্রতিটি ম্যাচে ভিভিআইপি গ্যালারিতে বসে থাকেন। তারা টকশোগুলোতে শুধুই সমালোচনা করে গেলেন। নিজেরা কোনো দিন কোচিং করালেন না ভালো করে। আর্জেন্টিনার প্রাক্তন ফুটবলাররা অনেকেই কোচিংয়ে আছেন। তাই তাদের কোচরা বিশ্ব শাসন করছেন। ব্রাজিলে কোচ বলতে কেউ নেই। আবার এদিকে সবাই কোচ। রোমারিও ‘ও গ্লোবো’তে লিখেছেন, আনচেলত্তির সঙ্গে বিশ্বকাপের আগেই ২০৩০ পর্যন্ত চু্ক্তি করা উচিত হয়নি। রোনাল্ডোর প্রশ্ন, কেন জোয়াও পেদ্রোকে নেওয়া হলো না। কেন এন্দ্রিককে প্রথম থেকে খেলানো হলো না? কাকাও সমালোচনা করেন তাঁর প্রাক্তন ক্লাব কোচের। তাঁর মতে, এস্তেভাও ও জোয়াও পেদ্রোকে না নেওয়াটা সবচেয়ে বড় ভুল আনচেলত্তির। ব্রাজিল যাঁকে প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে চেয়েছিল, সেই গার্দিওলার ধারণা, আনচেলত্তির আসল ভুল কুনিয়াকে তুলে নেওয়া। তার পরই ব্রাজিলের খেলা এলোমেলো হয়ে যায়। ফুটবলটা ছিল একেবারে রুটিন, সবাই যা বুঝতে পারবে। গার্দিওলা বলছেন, পেনাল্টিটা নেওয়া উচিত ছিল কুনিয়ার। তাঁকে ফাউল করা হয়েছিল বলে। দুই নম্বর হতে পারতেন ভিনিসিয়ুস।
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে আসা কোচ আনচেলত্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শুধু এই প্রশ্নটি নিয়েই রীতিমতো জেরা করেন ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকরা। উত্তরে এতটুকু টলেননি এই ইতালিয়ান কোচ। বরং তিনি জানিয়ে দেন, ভিনি ছিলেন তাদের পছন্দের ছয় নম্বর পেনাল্টি শুটার। ‘ম্যাচের ওই মুহূর্তে রাফিনিয়া (ইনজুরির কারণে) মাঠে ছিলেন না। নেইমার বা ইগর থিয়াগোও তখন একাদশে ছিলেন না। আর আমাদের সেই পূর্বনির্ধারিত গাণিতিক তালিকার শীর্ষে ভিনিসিয়ুস ছিলেন না; বরং ব্রুনো গিমারেস সেরা পাঁচে এগিয়ে ছিলেন। সে কারণেই গিমারেস শটটি নিয়েছিলেন।’ ব্রাজিল কোচ যতই গিমারেসের ওপর ভরসার কথা বলুক না কেন, ব্রাজিলিয়ান মিডিয়ার দাবি– এই গিমারেস মাত্র দুটি শট নিয়েছিলেন এ বছর! আসলে কোচের একগুঁয়েমি কিছু সিদ্ধান্তের বলি হতে হয়েছে ব্রাজিলকে– বিশ্বকাপ কভার করতে আসা ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকের একট বড় অংশ অন্তত তেমনটাই মনে করে। কেউ কেউ মনে করেন, এই নরওয়েকে নিয়ে গভীরভাবে পড়ালেখা করেননি ব্রাজিল কোচ। তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, ইউরোপের এই ‘জলদস্যুরা’ই ইতালিকে হারিয়ে এবারের আসরে এসেছে।
আসলে অন্তত তিনটি ভুলের কারণে ব্রাজিলের এই নক্ষত্র পতন। মাঝমাঠে ভারসাম্য ও পরিকল্পনার অভাব, চারজন ফরোয়ার্ডকে একসঙ্গে খেলানোর বড় ফাটকা খেলেছিলেন কোচ। ফলে মাঝমাঠে রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্রিজ ছিল না ম্যাচে। দ্বিতীয়ত, দলগত সংহতির চেয়ে ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরতা। টুর্নামেন্টজুড়েই ব্রাজিলের খেলায় দলগত কাঠামোর অভাব স্পষ্ট ছিল। ভিনিসিয়ুস, এন্দ্রিকের মতো তারকাদের ব্যক্তিগত ঝলকানি বা একক দক্ষতার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হলো দলকে। তৃতীয়ত, পেনাল্টি নষ্ট ও সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারত। ম্যাচের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা ব্রাজিলের ছিটকে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
আনচেলত্তি হয়তো সেলেসাওদের এই মহাবিপর্যয়কে একটা ‘নতুন চক্রের শুরু’ বলে সান্ত্বনা খুঁজবেন। কিন্তু হাডসন নদীর পাড়ের সেই বিষণ্ন রাত ফুটবল উৎসবের আকাশটাকে করে দিয়ে গেল চিরতরে অসম্পূর্ণ। সুদূর বাংলার আকাশে তাই পড়ে রইল কেবলই এক রূপহীন, বিবর্ণ আর ‘আধখোয়া চাঁদ’।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- আর্জেন্টিনা
- বিশ্বকাপ ফুটবল