কান্নারও দাম আছে: আর্জেন্টিনা ফাইনালে গেলে ফিফার কত লাভ?
মিশরের বিপক্ষে জয়ের পর অশ্রুসিক্ত আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৩৭ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৫২
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে মাঠে দুইবার কাঁদতে দেখা গেছে। প্রতিবারই সেটি গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল ফোনে দেখেছেন কোটি কোটি দর্শক। ব্যক্তিগতভাবে এই কান্নার পেছনে কোনো প্রাপ্তি বা টিকে থাকার আনন্দ থাকলেও পরোক্ষভাবে তা লাভবান করে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে। এমনকি বাজি ধরার প্ল্যাটফর্মগুলোও এ থেকে লাভবান হয়।
যেমন- এবার দিয়ে মোট ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাঁকে নিয়ে বাজার পূর্বাভাসের প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটে বাজি ধরা হয়েছিল- ‘রোনালদো কি এবারের বিশ্বকাপেও কাঁদবেন?’ সোমবার স্পেনের বিপক্ষে হারের পর রোনালদো কেঁদেছেন। বুধবার পলিমার্কেটের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, বাজিটির ওপর লেনদেন হয়েছে ৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
মেসির কান্না নিয়ে পলিমার্কেটে কোনো বাজি ধরা হয়েছিল কি না তা জানা যায়নি। তবে এই কান্নার ভিডিও থেকে অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সম্প্রচারকারী মাধ্যম ও ফিফা (ভবিষ্যতে) যে আয় করছে, তা কয়েকটি পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা যায়।

যেমন- মিশরের সঙ্গে ম্যাচের পর ‘লিওনেল মেসি ক্রাইং’ লিখে গুগলে সার্চ করে ৩৪ হাজার ভিডিও পাওয়া গেছে। সেগুলো প্রকাশ হয়েছে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। ‘আর্জেন্টিনা উইন’ লিখে সার্চ করে ভিডিও পাওয়া গেছে ৫ লাখ ১৬ হাজার। ঢাকার তেজগাঁও থেকে সার্চ করে পাওয়া এই পরিসংখ্যান কেবল বাংলাদেশের।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়ানো এমন অসংখ্য ভিডিও কত সংখ্যক মানুষ দেখেছেন সে পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ফিফা ও সম্প্রচার মাধ্যমের ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা যায়, মেসির মতো বিশ্বতারকার কান্না, উচ্ছ্বাস বা বিদায়- কোটি কোটি মানুষ লাইভ দেখে। পরে আবার ইউটিউবসহ অন্য সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে। দর্শক যত বেশি হয়, ফিফার ব্র্যান্ড ইমেজের সঙ্গে ম্যাচ সম্প্রচারকারীদের বিজ্ঞাপনের মূল্যও তত বাড়ে।
বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার হওয়া কান্নার ভিডিও থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিংবা সম্প্রচারকারীরাই যে শুধু আয় করছেন বিষয়টা তেমন নয়। ফিফা নিজেই তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, ‘কোনো ইভেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব কেবল কোনো অঞ্চলে নির্দিষ্ট সময় প্রচারের জন্য দেওয়া হয়। এটি মূলত ফিফার ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি (মেধা সম্পত্তি)।’ ফলে ফিফা চাইলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো মেসির কান্নার ভিডিওতে কপিরাইট ক্লেইম করেও আয় করতে পারবে।
ফিফার আয়ের লক্ষ্য কত?
বিশ্বকাপ থেকে ফিফার সম্ভাব্য আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। সংস্থাটি মূলত চারটি প্রধান খাতের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে- সম্প্রচার স্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট ও হসপিটালিটি এবং লাইসেন্সিং। আয়ের ক্ষেত্রে সম্প্রচার স্বত্ব বরাবরই সবচেয়ে বড় একক খাত হিসেবে অবদান রাখে। এরপর আছে স্পনসর বা পৃষ্ঠপোষকতা।

এবার বিশ্বের দুইশ’র বেশি অঞ্চলে টেলিভিশন ও স্ট্রিমিং স্বত্ব বিক্রি হয়েছে। আয় ৪০১ থেকে ৪৪১ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ২০২২ সালের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
ফিফা তিনটি স্তরে স্পনসরশিপ বিক্রি করে থাকে- ফিফা পার্টনার্স, ওয়ার্ল্ড কাপ স্পনসরস ও রিজিওনাল সাপোর্টার্স। এসব খাতের স্পনসরদের মধ্যে অন্যতম কাতার এয়ারওয়েজ, অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা ইত্যাদি। চলতি বছর স্পনসরশিপ থেকে আয় অন্তত ২৫৪ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লাইসেন্সিং ও মার্চেন্ডাইজিং খাত থেকে আয়ের সম্ভাব্য লক্ষ্য ৭০ কোটি ডলার। এছাড়া, টিকিট ও হসপিটালিটি থেকে আয় সর্বোচ্চ ৩২০ কোটি থেকে ৩২১ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি ২০২২ সালের তুলনায় ২১৬ শতাংশ বেশি। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ১০৪টি হওয়া এবং টিকিটের ক্ষেত্রে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা বাজার অনুযায়ী দাম পরিবর্তন করার কৌশলই মূলত এই বড় প্রবৃদ্ধির কারণ।
আর্জেন্টিনা থাকলে যত লাভ
কোনো ইভেন্টের টিকিটের পরিসংখ্যান তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘টিকিট ডেটা’। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে টিকে থাকলে ফিফার কত লাভ হতে পারে সেটির একটি নমুনা দেখা গেছে এই প্ল্যাটফর্মের ওয়েবসাইটে।
মঙ্গলবার রাতে মিশরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলার সময় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের দাম কয়েক দফায় ওঠানামা করেছে। সবচেয়ে কমদামী টিকিটের চার্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দামের ওঠানামার সঙ্গে মাঠের খেলার গতির সরাসরি মিল আছে।

খেলার ৭৯ মিনিটে আর্জেন্টিনা যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে, তখন ‘ডাইনামিক প্রাইসিংয়ে’ ওই দিনের টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য ১ হাজার ৯৩৩ ডলার থেকে এক ধাক্কায় কমে ৯৫৩-তে নেমে যায়। তবে আর্জেন্টিনা যখন নিজেদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গোল করে তখন টিকিটের দাম মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর কোয়ার্টার ফাইনালের সবচেয়ে কমদামী টিকিটের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪৬ ডলারে। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার টিকে থাকা না থাকার সঙ্গে টিকিটের দামের এমন অবিশ্বাস্য পতন ও আকস্মিক লাফ ফিফাকে কয়েক লাখ ডলারের লোকসান থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
ইয়াহু ফিন্যান্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি আসরে ফিফা নিজস্ব টিকিট পুনঃবিক্রয় প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছে। যেখানে নিজেদের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া প্রতিটি টিকিট থেকে তারা ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ কেটে রাখছে। আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত গেলে প্রতি ধাপের টিকিটগুলো থেকে ফিফা যদি ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ কেটে রাখে, তাহলে তাদের পকেটে সাত অঙ্কের মুনাফা যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
একটি গুরুতর অভিযোগ
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখা নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে মিসরের কোচ একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাচ শেষে কোচ হোসাম হাসান বলেন, ‘হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি যেন লড়াইয়ে টিকে থাকেন।’

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিয়ে ফিফার আগ্রহের বিষয় সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বক্তব্যেও উঠে এসেছে। রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাদের এই কঠিন লড়াই দেখে আমি নিজেও চিন্তিত ছিলাম।’ পরে তিনি বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, ‘আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম, ফিফা সভাপতি হিসেবে আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। আমি দুই দলের চমৎকার ম্যাচটি উপভোগ করছিলাম।’
ইনফান্তিনোর ওই বক্তব্য নিয়ে নানা মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মিশরের কোচ হোসাম হাসানও ফিফার পক্ষপাতমূলক আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘ফুটবলে অনেক সময় মাঠের কৌশলের বাইরেও কিছু বাহ্যিক প্রভাব কাজ করে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আজ সব স্তর থেকেই সমর্থন পেয়েছে।’
হোসাম হাসান আরও বলেন, ‘আমি এটিকে খারাপ ভাগ্য বলতে চাই না। আজকে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা অবিচারের শিকার হয়েছি।’ তবে এমন অভিযোগের বিষয়ে ফিফার পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি।