ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

শিরোপার আরও কাছে ফ্রান্স

শিরোপার আরও কাছে ফ্রান্স
×

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১২:৩৬

ফ্রান্সে যাপিত জীবনের পরতে পরতে ছবি-কবিতায় সুকুমার বৃত্তি। ফুটবলের ক্যানভাসকেও সাজায় বাহারি রঙে। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গত বৃহস্পতিবার বোস্টনে সেই সুন্দর ফুটবলের প্রদর্শনীই করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। মাইকেল ওলিসে, মানু কোনোর নিখুঁত পাসিংগুলো দেখাচ্ছিল পটে আঁকা ছবি। আর এমবাপ্পে, দেম্বেলে লেখেন জয়ের এপিক। একটি সফল ম্যাচের শেষের চিত্র এটি। এই চিত্রকর্মের সূচনায় আঁকিয়ে এমবাপ্পে, যার দারুণ গোলে জয়ের ভিত গড়ে ওঠে। আর দেম্বেলের গোল সেমিতে ওঠার নির্ভরতা। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে ফ্রান্স পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ব্রাজিল, জার্মানির পর টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা দল ফ্রান্স।

বিশ্বকাপের প্রথম থেকে দারুণ ফুটবল খেলছিল মরক্কো। ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালটিও প্রতিদ্বিন্দ্বতাপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে লড়াই জমাতে পারেননি হাকিমিরা। প্রথমার্ধ ছিল কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পাসিং ফুটবল খেলে গোলশূন্য রেখেছিলেন তারা। এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করায় সমতা রাখা সম্ভব হয়েছে। ২৫ মিনিটে বক্সের ভেতরে এমবাপ্পেকে ফাউল করেন মাজরাউক।

রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। এমবাপ্পে চেয়েছিলেন গোল করে এগিয়ে যেতে। সেটা সম্ভব হয়নি তাঁর মনোযোগে চিড় ধরায়। বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ সেভ করেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। এই সেভে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তাঁর। দেম্বেলেদের সামনে প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দেন তিনি। গোল পেতে ৬০ মিনিট লেগেছে ফ্রান্সের। দেজিরে দুয়ের কাছ থেকে বল পেয়ে বাঁকানো শটে দূরের পোস্টে পাঠান এমবাপ্পে। ডিফেন্সের গা ঘেঁষে বাঁক নেওয়া শটে ছিল মুনশিয়ানা। এই গোল দিয়ে লিওনেল মেসিকে ছুঁলেন তিনি। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে দুজনেরই আটটি করে গোল। তবে বিশ্বকাপে ২১টি গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে মেসি। একটি গোল কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এমবাপ্পে।

গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্টও করেছেন এমবাপ্পে। অধিনায়কের কাছ থেকে পাস পেয়ে ৬৬ মিনিটে গড়ানো শটে বল জালে জড়ান দেম্বেলে। এই বিশ্বকাপে পাঁচ গোল হলো তাঁর। ৭৭ মিনিটে গোড়ালির ব্যথা নিয়ে এমবাপ্পে মাঠ ছাড়ায় গোল ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ফ্রান্স। মরক্কোর রক্ষণের কাছে মুখ থুবড়ে পড়েছে বেশির ভাগ আক্রমণ। ফ্রান্সের বিপক্ষে ৫২ শতাংশ বলের দখল রাখার পরও গোল করতে না পারা চরম ব্যর্থতা মরক্কোর। তাদের স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবারির অভাবটা মারাত্মকভাবে অনুভূত হয়েছে ফরাসিদের বিপক্ষে। শেষ ষোলোর ম্যাচে ২০ মিনিটের মাথায় পেশির চোট নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন সাইবারি। কাতারের পর উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপেও ফ্রান্স বাধা অতিক্রম করা হলো না মরক্কোর। ২০২২ সালে সেমিফাইনালে ২-০ গোলে হারা দলটি বৃহস্পতিবার রাতেও হারে ২-০ গোলে। আফ্রিকার মুখ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাতেও সন্তুষ্ট নন মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহাবি, ‘আমরা যা করেছি, তাতে শুধু খুশি ও গর্বিত বললেই চলবে না। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আর তা করার জন্য আমাদের বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে এবং আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমরা যদি উন্নতি করতে চাই, তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’

দিদিয়ের দেশম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে উড়ছে ফ্রান্স। রেকর্ডের খেরোখাতা সমৃদ্ধ করছে প্রতিটি বিশ্বকাপে। ২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পরের বিশ্বকাপ জিতেছে ২০১৮ সালে রাশিয়ায়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছে টাইব্রেকারে। ২০২৬ সালেও বিশ্বকাপেও সেরা দল হিসেবে খেলছে। একের পর এক ম্যাচ জিতে উঠে গেছে সেরা চারে। বিশ্বকাপের তৃতীয় শিরোপা জয় থেকে ছোঁয়া দূরত্বে তারা। স্পেন-বেলজিয়াম ম্যাচের জয়ী দল ফ্রান্সের সেমিফাইনাল প্রতিপক্ষ। প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচটি হবে ১৪ জুলাই ডালাসে। এই বিশ্বকাপ শেষে ফ্রান্সের কোচের চাকরি ছাড়ার ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছেন দেশম। লক্ষ্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমরা ঠিক সেখানেই আছি, যেখানে আমরা থাকতে চেয়েছিলাম। আমি ধারণা করছি, ফ্রান্সে আবেগের বান ডেকেছে। আমরা এখানে নিজেদের জগতে আছি। খেলোয়াড়দের দায়িত্ব হলো এগিয়ে যাওয়ার জন্য সেরাটা দেওয়া। তারা সেটা দেওয়ায় একটি বড় ধাপ অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।’

কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে হারের ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন এমবাপ্পে। শিরোপা না জেতা পর্যন্ত সে আগুন নেভার নয়। তাই মেসি ও এমবাপ্পে দ্বৈরথ শিরোপা মঞ্চে যাওয়ার। এ দুই কিংবদন্তির লড়াই আরও অনেক দিক থেকেই– বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড, এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল, গোল্ডেন বল আর গোল্ডেন বুটের লড়াই। সবচেয়ে বড় লড়াই শিরোপা জিতে কিংবদন্তির কিংবদন্তি হওয়া। কারণ দুজনই একটি করে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী মেসিকে ছাপিয়ে যেতে নিজেকে ফাইনাল পর্যন্ত ফিট রাখতে চান এমবাপ্পে।

আরও পড়ুন

×