একলা মেঘের কান্না এমবাপ্পের
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, আটলান্টা থেকে
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:০১
স্টেডিয়ামের আকাশছোঁয়া ছাদটার নিচে যখন স্প্যানিশ আনন্দের উৎসব শুরু হলো, মাঠের ঠিক মাঝখানটায় তখন এক টুকরো কালো মেঘ জমাট বাঁধা। তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে; যাঁকে বিশ্বফুটবল চেনে এক বিধ্বংসী টর্নেডো হিসেবে, সেই তিনিই কিনা ম্যাচের পর দুই হাতের তালুতে মুখ ঢাকা, যেন বিশ্বসংসারের সমস্ত কোলাহল থেকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার এক আকুল চেষ্টা। তাঁর আঙুলের ফাঁক গলিয়ে চুইয়ে পড়া চোখের জলে ছিল ফরাসি ফুটবল-সাম্রাজ্যের ভেঙে পড়ার শব্দ।
অথচ বিশ্বকাপজুড়ে এই মেঘের বুকে জমেছিল আকাশ ছোঁয়ার আকুলতা। একের পর এক গোল করে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালের মঞ্চে টেনে এনেছিলেন ঠিকই। শেষ অঙ্কের মহাকাব্যে এসে স্পেনের ‘লাল কমলের’ মায়াজালে তিনি নিজেই বন্দি হয়ে গেলেন! আসলে জীবন তো নিখুঁত কবিতা নয়, সেখানে ট্র্যাজেডিও থাকে। শেষ পর্যন্ত মেজাজ হারিয়ে স্প্যানিশ গোলরক্ষককে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ডও দেখলেন। যে নীলমণিকে ঘিরে ফরাসিদের এত অহংকার, তিনি বিশ্বকাপ শেষ করলেন কিনা বিষাদের অন্ধকারে।
বিশ্বকাপের ট্রফিটা এবারও ছোঁয়া হলো না তাঁর। তবে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেলেও কিলিয়ান এমবাপ্পের একটা ব্যক্তিগত যুদ্ধ এখনও কিন্তু সাঙ্গ হয়নি। সোনার বুটের রাজকীয় লড়াইটা এখনও বেঁচে আছে আটটি গোল আর তিনটি অ্যাসিস্টে। নিয়মরক্ষার ‘তৃতীয় স্থান নির্ধারণী’ ম্যাচে হয়তো সেই বুটটা হাতে তুলে নিতে পারবেন তিনি। সেটি অবশ্যই বুকে পাথরচাপা দিয়ে। আসলে খেলা শেষ হলে সব আলো যখন নিভে যায়, তখন কোটি কোটি মানুষের হাহাকার আর পরাজয়ের এই নীল অতলান্ত একাকিত্বটা অধিনায়কের কাঁধেই এসে চেপে বসে। এমবাপ্পে হয়তো আজ রাতের অন্ধকারে সেই অমোঘ সত্যটাই আবিষ্কার করলেন। স্বীকার করে নিলেন তাঁর ব্যর্থতাটুকু।
‘যখন আপনি জিতবেন, তখন সব প্রশংসা আপনার হবে। আর যখন জিতবেন না, তখন সব সমালোচনাও আপনাকে নিতে হবে। এটি খেলারই অংশ, এটি আমার জীবনের অংশ। দলের অধিনায়ক হিসেবে এই হারের সব দায় আমি নিজের কাঁধে নিচ্ছি এবং এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া ম্যাচের পরপরই দায় কাঁধে নিয়ে নেন এমবাপ্পে। এটিও স্বীকার করে নেন, স্পেনের কৌশলের কাছে রীতিমতো মার খেয়েছেন তারা। তবে এ জন্য কোচ দেশমের দিকে আঙুল তুলতে রাজি নন। ‘স্পেন তাদের নিজস্ব পরিকল্পনায় অনড় ছিল এবং তারা সফল হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, ওদের ওপর শুরু থেকে হাই-প্রেস করা, যাতে ওরা নিজেদের ছন্দ তৈরি করতে না পারে। আমরা তা করতে পারিনি। মাঠে আমাদের প্রচুর ভুল হয়েছে এবং ঠিক যে সময়ে স্পেনকে আঘাত করা উচিত ছিল, আমরা তা করতে ব্যর্থ হয়েছি।’ দেশম সম্পর্কে বলেন, ‘আজকের হার সত্ত্বেও একজন ফরাসি নাগরিক, খেলোয়াড় বা ম্যানেজার হিসেবে দেশম আমাদের কাছে যা, তার কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি ফুটবলে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস লিখেছেন।’ আসলে দেশমের কিশোর ছাত্র হয়েই ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। তাই কোচের শেষ বেলায় তাঁকে নিয়ে লোকের সামনে আর ব্যর্থতার কথা বলতে চাইছিলেন না এমবাপ্পে।
ম্যাচটা আসলে ট্যাকটিক্যালি এমবাপ্পে হেরে গিয়েছিলেন প্রথমার্ধের মাঝপথেই। মিনিটের কাঁটা ধরে যদি এগোই, তবে ২২ মিনিটের মাথায় যখন পেনাল্টি থেকে ওয়াইরসাবাল স্পেনকে এগিয়ে দিলেন, তখনই ফরাসি অধিনায়ক তাঁর স্বাভাবিক ঠান্ডা মাথার ফুটবলটা হারিয়ে ফেললেন। অধিনায়ক হিসেবে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার যে তাগিদ, সেটিই তাঁর খেলার সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়াল। এর পর থেকে প্রতিটি মিনিটে তিনি বড্ড বেশি একা খেলার চেষ্টা করছিলেন, যেন সতীর্থদের ওপর তাঁর কোনো ভরসাই নেই। উইং ধরে তাঁর সেই চেনা বিষাক্ত দৌড়গুলো আজ স্পেনের ডিফেন্স নিখুঁতভাবে রিড করে ফেলেছিল। ম্যাচে তিনি তিনটি শট নিলেও মাত্র একটি শট গোলপোস্টে রাখতে পেরেছিলেন।
স্পেনের ডিফেন্ডার পেদ্রো-কারভাহালদের কড়া নজরে বক্সে তাঁর চেনা ড্রিবলিংগুলো (ছয়টির মধ্যে পাঁচটিই ব্যর্থ) একদম খেই হারিয়ে ফেলেছিল। অন্যতম বড় খামতি ছিল তাঁর ১৪ বার বলের নিয়ন্ত্রণ হারানো, যা ফ্রান্সের মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগে বল স্থানান্তরের পরিকল্পনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে দেয়। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে, ইনজুরি টাইমে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে পাওয়া সেই মহামূল্যবান ফ্রিকিক, যেখান থেকে লুসাইলে হলে হয়তো জাল ছিঁড়ে ফেলতেন; সেটি যখন পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে আকাশে হারিয়ে গেল, তখনই বোঝা গিয়েছিল, ফুটবল-বিধাতা আজ এমবাপ্পের পায়ে কোনো জাদুর ছোঁয়া বরাদ্দ রাখেননি। সারা ম্যাচে মাত্র ৩৪ বার বল স্পর্শ করা– এটিই ডালাসের রাতে এমবাপ্পের ফুটবল ট্র্যাজেডির আসল এক্স-রে রিপোর্ট।
অথচ এই বিশ্বকাপেই কী রাজকীয় ছন্দে না টুর্নামেন্টটা শুরু করেছিলেন তিনি! একেকটি ম্যাচে তাঁর সেই অতিমানবীয় দৌড় আর একের পর এক গোল দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও নিখুঁত পারফরম্যান্স। কিন্তু ট্র্যাজেডি তো এখানেই– যে টুর্নামেন্টকে নিজের সেরা ফুটবল দিয়ে রাঙিয়ে তুললেন, ঠিক শেষ অঙ্কে এসে, সবচেয়ে বড় মঞ্চেই তিনি কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেললেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত রণকৌশলের জালে বন্দি হয়ে ১৪ বার পজিশন হারানো। ইতিহাস মনে রাখবে তাঁর গতিকে, কিন্তু ফুটবলের রোমান্টিকরা হয়তো মনে রাখবেন এক নীলমণির একাকিত্বের ট্র্যাজেডিকে, যিনি সব পেয়েও শেষ পর্যন্ত কিছুই পেলেন না।
- বিষয় :
- কিলিয়ান এমবাপ্পে
- ফ্রান্স
- বিশ্বকাপ ফুটবল