ভাগ্যের কাছে পরাজিত দিদিয়ের দেশম
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪১
হৃদয়ের খাতায় পূর্ণতা খোঁজা বৃথা– এই উপলব্ধি এখন দিদিয়ের দেশমের। সেমিফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে যে মানুষটির উপলব্ধি ছিল তারাই বিশ্বের সেরা। গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পেদের পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানও সে বার্তাই দিয়েছে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের প্রশংসাবৃষ্টিতে ভিজে মিলেছে স্বর্গীয় সুখ। বিশ্বকাপের তৃতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন উঁকি-ঝুঁকি দিয়েছে শেষ চারের লড়াইয়ের আগেও। স্পেন সেই দলটিকেই শূন্য থেকে টেনে মাটিতে নামায় মঙ্গলবার রাতে।
দেশমও বুঝতে পারলেন, জীবনের প্রতি বাঁকে লুকিয়ে থাকে রহস্য। সেই জাল ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার নামই সাফল্য। যে পথে এগিয়ে গেছে স্পেন। আর হোঁচট খাওয়া ফ্রান্স খেলবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী। এই ম্যাচটি জিতে কোচ দিদিয়ের দেশমকে উৎসর্গ করতে চান অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। কারণ, ফ্রান্সের ডাগআউটে কোচের শেষ ম্যাচ সেটি। দেশম ভাগ্যের খেলায় হেরে গেলেও ভালোবাসার খেলায় বিজয়ী।
খেলোয়াড় ও কোচ দুই ভূমিকায় দারুণ সফল একজন মানুষ দেশম। ১৯৯৮ সালে তাঁর নেতৃত্বেই ফ্রান্স প্রথম বিশ্বকাপ জেতে দেশের মাটিতে। ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে জেতেন শিরোপা। আর কাতার বিশ্বকাপে রানার্সআপ। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ শেষ করতে চেয়েছিলেন শিরোপা জিতে। সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া ফ্রান্স দলটিও ছিল স্বপ্নছোঁয়ার পথে। দেশমের কল্পনাতেও ছিল না, এভাবে থেমে যেতে হতে পারে। সেমিফাইনালে হোঁচট খাওয়া দলের অধিনায়কের চাওয়া এখন, ‘তাঁর (দেশম) জন্য আর একটি ম্যাচ পড়ে আছে। সেই ম্যাচে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে হবে। কারণ, তাঁর ও সমর্থকদের সেটি প্রাপ্য। এই বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে শেষ করতে চাই।’
বিশ্বকাপের আগে থেকেই আলোচনায় ছিল ফ্রান্স। বিশ্লেষকরা বলাবলি করেছে, ফরাসি দলের রিজার্ভ বেঞ্চ অনেক দেশের মূল একাদশের থেকেও শক্তিশালী। এমন একটি দলের কাছে বিশ্বকাপ শিরোপা প্রত্যাশা করা খুব স্বাভাবিক। দেশমের চাওয়া তাই ঠিকই ছিল। কিছু ভুলের কারণে পূর্ণতা পেল না সে চাওয়া। ফেভারিটের তকমা হয়তো চাপে ফেলেছিল উসমান দেম্বেলেদের।
স্পেনের কাছে পিছিয়ে পড়ার পর চালে ভুল করেন কোচ নিজেও। দ্বিতীয়ার্ধে রিজার্ভ বেঞ্চ খেলানো ছিল এক ধরনের ভুল। ওলিসেকে তুলে নেওয়ার পর আক্রমণ মুখ থুবড়ে পড়ে। ডাগআউট থেকে এমবাপ্পেদের সঠিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। এই ভুলই কোচের বিদায় রাঙাতে দেয়নি। অথচ খেলোয়াড়দের ইচ্ছা ছিল, প্রিয় কোচকে রাজকীয় বিদায় দেওয়া। অপূর্ণই থেকে গেল তাদের চাওয়া। তবে ২০১২ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে ফ্রান্সকে দুবার ফাইনালে নিয়ে গেছেন দেশম। একবার চ্যাম্পিয়ন ও একবার রানার্সআপ হয়েছে দেশটি। রেকর্ডের খেরোখাতায় যোগ হয়েছে কিছু পরিসংখ্যান। বিশ্বকাপে ২৬টি ম্যাচে ফ্রান্সের ডাগআউটে থেকে দেশম গড়েন বিশ্বরেকর্ড।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোচ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফ্রান্স দলের সঙ্গে পথচলা শেষ করবেন বিশ্বকাপে। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। আমি সেমিফাইনালে বা ফাইনালে কোনো প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিচ্ছি কি না, ব্যক্তিগতভাবে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তবে ১৪ বছরের কোচিং ক্যারিয়ার নিয়ে গর্বিত কোচ, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। বিশ্বকাপ জিততে পেরেছি। ফরাসি দলকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যা কিছু করেছি, তার জন্য আমি গর্বিত।’
দুই জীবন মেলাতে গিয়ে কোচ বলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমি ভাগ্যবান। আমি সুখের মুহূর্ত উপভোগ করেছি। আজকের (সেমিফাইনাল) মুহূর্তটি তেমন নয়।’
ফরাসি ফুটবলের খোঁজ রাখেন এমন সবাই মনে করেন, সিংহদ্বার দিয়েই দেশমের বিদায় নেওয়া উচিত ছিল। দেশটির সাবেক স্ট্রাইকার অলিভার জিরুত ঢাল হয়ে দাঁড়ান দেশমের পাশে, ‘দিদিয়েরকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ও প্রাপ্য সমাপ্তিটা দেওয়ার জন্য এই বিশ্বকাপে সব খেলোয়াড়ের মধ্যেই বাড়তি প্রেরণা ছিল। তার সদর দরজা দিয়ে বিদায় নেওয়াই উচিত ছিল। তিনি ঠিক তা করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে যা করেছেন, তার জন্য তিনি এখনও একজন কিংবদন্তি। রেকর্ডই তাঁর হয়ে কথা বলে।’ কিছু অপূর্ণতা থাকে বলেই আকাঙ্ক্ষারাও বেঁচে থাকে।