ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা-স্পেন

শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা-স্পেন
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩৪

একদিকে সমস্ত কীর্তি আর ক্লান্তি শেষে নিজের শেষ মশাল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিদায়ী কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, যাঁর পায়ের জাদুতে কাতারের পর এবার আর্জেন্টিনার চতুর্থ বিশ্বকাপ ঘরে তোলার অদম্য জেদ। অন্য প্রান্তে ঠিক সেই মহাপ্রস্থানের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এক অনিরুদ্ধ নবীন সূর্য লামিনে ইয়ামাল, যাঁর তিকিতাকার মায়াজালে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। দুই প্রজন্মের সন্ধিক্ষণে বিশ্বকাপের এক ঐতিহাসিক ফাইনালের সামনে দাঁড়িয়ে আজ নিউ জার্সি। আমেরিকার মাটি ফুটবলকে কতটুকু চেনে, তা নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু ফুটবলের উন্মাদনা যে এখানে আকাশ ছুঁয়েছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ম্যানহাটানের আকাশছোঁয়া করপোরেট অফিস থেকে শুরু করে মেট্রোরেলের শেষ গলি, ব্রঙ্কসের বাঙালিপাড়ার চিরচেনা চায়ের আড্ডা থেকে খোদ হোয়াইট হাউসের অন্দরমহল– এ মুহূর্তে গোটা আমেরিকা বুঁদ হয়ে আছে শুধু এই একটি ফাইনাল ঘিরে!

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক গালিচায় আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই ভিন্ন ফুটবলীয় গ্যালাক্সি– কোপা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আর ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। গ্যালারিতে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন চোখ রাখবেন নক্ষত্রদের এই লড়াইয়ে, তেমনি তাঁর পাশে ভিড় জমাবেন হলিউড থেকে শুরু করে বিশ্ব ক্রীড়াজগতের সমস্ত জ্বলজ্বলে নক্ষত্রেরা। সবার কৌতূহল– কার মাথায় উঠবে বিশ্বকাপের মুকুট? অতীত বলে, উত্তর আমেরিকার মাটিতে কখনও কোনো ইউরোপীয় দল বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আবার ইতিহাস এটিও বলে, র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দলও কখনও বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খেতে পারেনি। তাই অতীতকে মেটলাইফের ঘাসে কবর দিয়ে আজ দুই পরাশক্তিই আমেরিকার মাটিতে নতুন করে চোখ বাঁধছে এক অলৌকিক ‘আমেরিকান ড্রিমে’। ১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২ সালের পর নিজেদের জার্সিতে আরেকটা স্টার চিহ্ন করিয়ে নিতে চায় আর্জেন্টিনা। অধিনায়ক হিসেবে দুবার বিশ্বকাপ জিতেও অমর হয়ে থাকতে চান লিওলেন মেসি। ফুটবল ইতিহাসের গত ১০০ বছরের খেরোখাতায় কোনো খেলোয়াড়রই অধিনায়ক হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। অন্যদিকে ২০১০ সালের সেই সোনালি প্রজন্মের পর স্পেনের সামনে সুযোগ এসেছে এবার দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি জয়ের। ইয়ামালদের এই ডায়মন্ড জেনারেশন নিশ্চয় সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না।

আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের এই ব্লকবাস্টার ফাইনালের আবহতে উত্তেজনা থাকলেও কেন যেন কোনো বারুদ বা অন্ধ আক্রোশের ঝাঁজালো আস্ফালন নেই। মনের ভেতর কোনো কুৎসিত বৈরিতা বা তিক্ততার ফণা জেগে ওঠে না; বরং ভেসে ওঠে এক পরম আত্মীয়তার নিবিড় কোলাজ। ফুটবল মাঠে অনেক সময় যে বারুদ বা রাজনৈতিক বিদ্বেষের ঝাঁজ দেখা যায় (যেমনটা দেখা যেত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে), স্পেন-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ সেখানে এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী প্রশান্তি। এ দুই দেশের নাড়ির টান যে বড় অদ্ভুত! একই ভাষা, প্রায় কাছাকাছি সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক দীর্ঘ পথচলা। ফুটবলবিশ্বে তারা একে অপরের শত্রু নয়; বরং একই বৃন্তের দুটি ভিন্ন ফুল। এখানকার অনেক মিডিয়ায় এই ফাইনালকে ‘বাথটাব টু ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল’ বলে মেসি-ইয়ামালের পুরোনো ছবি প্রকাশ করেছে। ২০০৭ সালের সেই চেনা ইউনিসেফের ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে উঠে আসা এক অলৌকিক রূপকথা, যেখানে পাঁচ মাসের এক অবোধ শিশু লামিনে ইয়ামালকে পরম মমতায় স্নান করিয়েছিলেন এক তরুণ জাদুকর। নিয়তির কী তীব্র চাবুক, আজ সেই ১৯ বছরের ইয়ামালই প্রতিপক্ষ শিবিরে মেসি-সাম্রাজ্য ধ্বংসের পণ নিয়ে বিশ্বজয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে!

এই যুদ্ধটি যতটা তীব্র আবেগের, ততটাই ক্ষুরধার মস্তিষ্কের দাবার চালেও। লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই নতুন স্পেন দলটি সেই পুরোনো ধীরগতির, ঘুমপাড়ানি তিকিতাকার খোলস ভেঙে এখন এক ভয়ংকর, প্রলয়ংকরী গতির ফুটবল খেলছে। যেটিকে তিকিতাকা ভার্সন টু বলা যেতেই পারে। দুই ডানায় লামিনে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামস– এ দুই ক্ষুরধার উইঙ্গার যেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেওয়ার একেকটা জীবন্ত বারুদ। মাঝমাঠে রদ্রি নামের এক ফুটবল-জেনারেলের নিখুঁত জ্যামিতিক পাসিং আর ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার অলৌকিক ক্ষমতা স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তির মুকুট। কিন্তু এই অপরাজেয় দলটিরও একটা দুর্বল পাঁজর আছে। তাদের রক্ষণভাগ কিন্তু এখনও পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নয়, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের আচমকা কাউন্টার-অ্যাটাকের গতিতে লাপোর্তেদের কিছুটা খাবি খেতে দেখা গেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরের সবচেয়ে বড় শক্তি আর বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়স্থলটির নাম তো খোদ লিওনেল মেসি, যাঁর পায়ের একেকটা স্পর্শে আজও ম্যাচের ভাগ্য এক নিমেষে বদলে যায়। তার ওপর ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আর লিসান্দ্রো মার্তিনেজের সেই আগ্রাসী, নিটোল ও লৌহকঠিন রক্ষণভাগের দেয়াল ভাঙা যে কোনো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আর অতিপ্রাকৃতিক ক্ষিপ্রতা আর্জেন্টিনাকে এক বাড়তি লাইফলাইন দেয়। তবে আলবিসেলেস্তেদেরও চিন্তার একটা ধূসর রেখা আছে। ম্যাচের প্রথমার্ধে মাঝমাঠের দখল ধরে রাখার ক্ষেত্রে রদ্রিগো ডি পল কিংবা এনজো ফার্নান্দেজদের সাময়িক ছন্দহীনতা মাঝেমধ্যে স্কালোনিকে প্রচণ্ড ভাবিয়ে তোলে।

আজ যে দুই পরাশক্তি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তারা কেউ কিন্তু কার্পেটে বিছানো লালগালিচা পেরিয়ে এখানে আসেনি! দুদলকেই পাড়ি দিতে হয়েছে একেকটা কণ্টকাকীর্ণ মরুভূমি। গ্রুপ পর্বের সেই শুরুর ম্যাচগুলোয় আর্জেন্টিনার খেলা দেখে বুক কেঁপে উঠেছিল কোটি ভক্তের। মাঝমাঠের সেই চেনা ছন্দহীনতা, প্রতিপক্ষের কড়া ট্যাকল আর ইনজুরির থাবায় জর্জরিত দলটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হয়েছে। খোদ স্কালোনিকে ডাগআউটে বসে চিন্তার নখ খুঁটতে দেখা গেছে। কিন্তু নকআউটের সাইরেন বাজতেই আলবিসেলেস্তেরা যেন রূপ নিল এক একরোখা, শিকারি নেকড়েতে! কোয়ার্টার আর সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষের একের পর এক চড়া আক্রমণকে ডি পল-রোমেরোরা যেভাবে বুকের ছাতি দিয়ে রুখে দিলেন আর বুড়ো হাড়ের ভেল্কিতে মেসি যেভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ফালি ফালি করে কাটলেন– তা স্রেফ ফুটবল নয়, তা হলো এক মরণপণ ‘কিলার ইনস্টিংকট’ বা খুনে মেজাজের পুনরুত্থান।

স্পেনের গল্পটাও কি খুব কুসুমকোমল ছিল? গ্রুপ পর্বের ‘ডেথ জোন’ বা মৃত্যুর গ্রুপে যখন তারা খেলছিল, ইউরোপীয় মিডিয়া তো তাদের অনভিজ্ঞ তরুণদের কঙ্কাল বের করে ফেলার জন্য কলম উঁচিয়ে ধরেছিল। সমালোচকদের সেই বিষাক্ত বাণ বুকে নিয়েই লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই নবীন ব্রিগেড লড়েছে। কিন্তু নকআউটের রাউন্ড অব সিক্সটিন আর কোয়ার্টারের সেই হাই-ভোল্টেজ রাতে ইয়ামাল-উইলিয়ামসরা যেভাবে নিজেদের মেলে ধরলেন, তা এককথায় অসাধারণ। তিকিতাকার সেই পুরোনো মায়াজালের সঙ্গে আধুনিক পাওয়ার ফুটবলের এমন বৈপ্লবিক জেনেসিস ঘটিয়ে তারা একের পর এক হেভিওয়েটদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে মেটলাইফের টিকিট কেটেছে। দুই দলই গ্রুপ পর্বের ক্ষত বুকে নিয়ে নকআউটের আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে আজ ফাইনালে এসেছে। তাই আজ রাতে কেউ এক ইঞ্চি জমি ছাড়বে না, এটা নিশ্চিত; তা যতই দুই কোচ গুরু-শিষ্য হোক না কেন, যতই মেসির হৃদয়ে বার্সা থাকুক না কেন, যতই ইয়ামালকে মেসি স্নান করাক না কেন! অতীত বলে, মুখোমুখি লড়াইয়ে কোপা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আর ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন কেউ কাউকে কখনও ছেড়ে দেয়নি।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় এর আগে যে ১৪ বার এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, সেখানে একদম সমান সমান কাঁটায় ছিটকে গেছে দুই গোলার্ধ– উভয় দলই জিতেছে ছয়টি করে ম্যাচ আর বাকি দুটি ম্যাচ থমকে গেছে অমীমাংসিত ড্রয়ের খেরোখাতায়! অথচ বিশ্বকাপের মহামঞ্চে তাদের ঐতিহাসিক মোলাকাত হয়েছিল সেই সুদূর ১৯৬৬ সালের গ্রুপ পর্বে, যেখানে লুইস আরতিমিসের জোড়া গোলে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে স্প্যানিশ দুর্গ চুরমার করেছিল। এরপর দীর্ঘ ৬০ বছর কেটে গেছে, নদী দিয়ে বয়ে গেছে কত কোটি গ্যালন জল; কিন্তু বিশ্বমঞ্চের কোনো নকআউট পর্বে তো দূর, ফাইনালের মহাকাব্যে এ দুই মহাসমুদ্রের জল কখনও এক মোহনায় মেশেনি। ২০১৮ সালে প্রীতি ম্যাচের ছদ্মবেশে রাশিয়া বিশ্বকাপের ঠিক আগে স্পেন যখন আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলের এক নির্মম, রক্তক্ষয়ী ক্ষত উপহার দিয়েছিল; খোদ লিওনেল স্কালোনি তখন ডাগআউটে বসে সেই যন্ত্রণার বিষ নীলকণ্ঠের মতো গিলেছিলেন। আজ মেটলাইফের মহাকাব্যিক রণাঙ্গনে সেই পুরোনো হিসাব-নিকাশের খাতা কেবল খোলার পালা নয়; আজ ইতিহাস নিজেই এক অলৌকিক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেখানে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সেই অমরত্বের সিংহাসনে বসার মরণপণ লড়াইয়ে নামছে, ওপারে তখন লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন ২০১০ সালের পর তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার জন্য তিকিতাকার ধারালো তলোয়ার শানাচ্ছে। আজ রাতের পর আর কোনো সমতার ছক থাকবে না। ইতিহাসের এই রাজকীয় নোঙর ছিঁড়ে যে কোনো এক দল চিরতরে এগিয়ে যাবে অন্য দলের চেয়ে।

আরও পড়ুন

×