দেশপ্রেম
দেশ ছাড়লেও বাঙালিয়ানা ছাড়েননি
প্রিয় দলের খেলা দেখতে পতাকা হাতে এসেছিলেন ম্যাকাইয়ে থাকা বাঙালিরা। ছবি: সমকাল
সেকান্দার আলী, ম্যাকাই থেকে
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২১
‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।’ এই গানের প্রতিটি শব্দ বাঙালি ও বাংলাদেশিদের মনের কথা। বিদেশে ক্রিকেট সিরিজের রিপোর্ট করতে এসে এই অমোঘ সত্যটা উপলব্ধি করছি প্রতিনিয়ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচের রিপোর্ট করতে ম্যাকাইয়ে পৌঁছানোর দিন থেকে বুঝতে পারছি বাঙালির শিকড় ভীষণ গভীরে।
সাত সমুদ্র তেরো নদীর তলদেশ দিয়ে জাতীয়তা বোধের শেকড় পৌঁছে গেছে বাংলাদেশে। আসলে যেখানে নাড়ি পোঁতা থাকে, তার শিকড় কোনো দিন ছেঁড়ার নয়। বরং আরও গভীর হয় বংশলতিকায়। অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীদের দেখে অন্তত তাই মনে হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেদিন ম্যাকাইয়ে ঘাঁটি গাড়ে, সেদিন থেকে বদলে গেছে এই শহরে বসবাসকারী বাঙালিদের সাজপোশাক। ব্র্যান্ডের শর্টের জায়গায় লাল-সবুজ জার্সিকেই অফিসের পোশাক বানিয়ে নিয়েছেন। জাতীয় দলের ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ বা ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের পাশে নানা সেবা নিয়ে হাজির হচ্ছেন অনেকে।
জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অনেকের ভাত-ভর্তা-মাছ-মাংস পছন্দের খাবার। মেরু অঞ্চলে গেলেও প্রিয় খাবারের সন্ধান করবেন তারা। জানা গেছে, ডারউইনে খাবার নিয়ে কষ্টে ছিলেন ক্রিকেটারদের কেউ কেউ। এই খবর ম্যাকাইয়ের বাঙালিদের কানে দিতেই বাড়ি বাড়ি উনুনে ভাত, মাছ রান্না হয়েছে। ক্রিকেটাররাও তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছেন। কেউ কেউ টিম হোটেলের সামনে অপেক্ষা করেছেন ক্রিকেটার বা তাদের পরিবারকে লিফট দেওয়ার জন্য। এই মানুষগুলোই বিদেশের মাটিতে দেশে খেলার অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করেন ক্রিকেটের মাঠে। দেশের পতাকা নিয়ে গ্যালারি থেকে সমর্থন দেন গলা ফাটানো স্লোগানে। ম্যাকাইয়ে সদ্য শেষ হওয়া টেস্ট ম্যাচটি নিয়েও ভীষণ আবেগ দেখা গেছে। হাজার মাইল দূরে থেকে খেলা দেখতে এসেছেন অনেক বাংলাদেশি।
স্যুট-টাই পরে অফিস করা একাধিক তরুণ লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে এসেছেন মাঠে। চিকিৎসক, প্রকৌশলীরা পরিবার নিয়ে এসেছিলেন শিকড়ের টানে। যে ছেলে বা মেয়েটি অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নিয়েছেন, এক দিনের জন্যও বাংলাদেশে যাননি, ভাঙা ভাঙা বাংলা বলা সেই ছেলে বা মেয়েটি হয়ে উঠেছিলেন খাঁটি বাংলাদেশি। তারা নিজেকে আলাদা করেছেন সাজপোশাকে।
কুইন্সল্যান্ডের মাকাইয়ে দেড়শর মতো বাঙালি পরিবার থাকে বলে জানা গেছে। এই পরিবারগুলোর বেশির ভাগ সদস্য উচ্চশিক্ষিত। অধিকাংশ পরিবারে নাকি একজন করে চিকিৎসক রয়েছেন। সেই প্রমাণ কিছুটা পাওয়া গেছে মাঠে পরিচিত হওয়ার সময়। শিক্ষিত ও দক্ষ হওয়ায় ম্যাকাইয়ে বসবাস করা বাংলাদেশিরা ভালো চাকরি করেন। মিড সিটি মোটর ইন মোটেলের ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম দেশে বিএনপির রাজনীতি করতেন। এক যুগেরও বেশি সময় এই দেশে বসবাস করলেও শিকড়ের টান অনুভব করেন।
হোটেলে কক্ষ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে ভীষণ বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। আসলে টেস্ট ম্যাচকে কেন্দ্র করে ছোট্ট শহর ম্যাকাইয়ে হোটেল- মোটেলগুলো পর্যটকে ঠাসা ছিল। দেড়শ ডলারের কক্ষ ৫০০ ডলারেও মিলছিল না। বুকিং না থাকায় পাঁচ দিন কক্ষ পরিবর্তন করতে হয়েছে। তবুও কৃতজ্ঞতা– রাতে মাথার ওপর একটি ছাদ ছিল ন্যায্যমূল্যে। উন্নত বিশ্বে থাকলেও একজনকে খাঁটি বাঙালি চিনতে পরিবারের অন্দর মহলে ঢুকে পড়তে পারেন। কারণ, একান্নবর্তী পরিবারের সঙ্গটাকে টিকিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশিরা। ছেলেমেয়ের বিয়ে হওয়ার পরও আগলে রাখেন মা-বাবা। ছেলেমেয়েকে অনুশাসনে রেখে প্রতিষ্ঠিত করতে স্বামী-স্ত্রী থাকেন ভিন্ন দুটি রাজ্যে। আসলে তারা দেশ ছাড়লেও বাঙালিয়ানা ছাড়েননি।
- বিষয় :
- দেশপ্রেম