ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

দাবার ছকে দেশের রাণী, নারী অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক যিনি

দাবার ছকে দেশের রাণী, নারী অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক যিনি
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২১ | ০০:৩২

বাংলাদেশের দাবার ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখা পাই এক সোনালি অতীতের। ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপ্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার-এর আবির্ভাব এ দেশেই। ১৯৮০ সালের সেই ঐতিহাসিক জয় এসেছিলো বাংলাদেশ এফআইডিই (দ্য ইন্টারন্যাশনাল চেজ ফেডারেশন) এর সদস্য হওয়ার ঠিক কিছুদিন পরপরই। একইসময়ে একজন বাংলাদেশী নারী দাবাড়ু ব্রিটেনের ন্যাশনাল দাবা প্রতিযোগিতায় সাড়া ফেলেছিলেন একের পর এক শিরোপা জয় করে। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ এর মাঝে তিনি তিনটি চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জিতে নেন ব্রিটিশ মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় বিশ্বসেরাদের সাথে লড়াই করে। পরবর্তীতে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন রাণী নামে– দাবার রাণী এবং বাস্তবে যার নাম– রানী হামিদ। প্রেরণার কথা দ্বিতীয় সিজনের দ্বিতীয় পর্বে তার থেকেই আমরা শুনেছিলাম দাবাতে তার বিশ্বজয় ও সফলতা সম্পর্কে।

খুব ছোটবেলা থেকেই রানী হামিদের দাবার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। ছোটবেলায় বাবা যখন দাবা খেলতেন, তখন তিনি বাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে বাবার পাশে বসে খেলা দেখতেন। সেই খেলা দেখতে দেখতেই তিনি একসময় নিজেই দাবায় বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার দাবা ক্যারিয়ার শুরু হয় বেশ পরে– যখন তার বয়স ৩৪ বছর। প্রয়াত স্বামী লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর মূলত তিনি সাংসারিক কাজেই ব্যস্ত হয়ে যান। কিন্তু এম এ হামিদ নিজেই ছিলেন একজন ক্রীড়া সম্পাদক এবং তিনি চাইতেন যেন রানী হামিদ তার দাবার প্রতিভা পেশাদার ক্যারিয়ারে রূপান্তর করেন। এমনই একটি সুবর্ণ সুযোগ আসে ১৯৭৭ সালে যখন এম এ হামিদের অনুপ্রেরণায় রানী হামিদ বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। শুধুমাত্র এই প্রতিযোগিতায়ই নয়, তিনি পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ন্যাশনাল মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপেও বিজয়ীর শিরোপা জিতে প্রমাণ করেন যে তৎকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশের সেরা মহিলা দাবাড়ু। দাবার বিশ্বমঞ্চে তিনি তার উপস্থিতি জানান দেন, ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম এফআইডিই ওমেন ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হয়ে।

প্রেরণার কথার সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে তিনি বলেন, ‘আমরা দাবা খেলার সময়ে তো এতো শিরোপা জয় বা রেকর্ড ভাঙার কথা নিয়ে ভাবতাম না, আমাদের দাবা খেলার প্রতি ভালোলাগা থেকেই খেলতাম’। শিরোপা নিয়ে না ভাবলেও তার শিরোপার তালিকা বেশ লম্বা। দীর্ঘ ৪৪ বছরের লম্বা ক্যারিয়ারে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯টি পদক জিতেছেন, যার মাঝে কমনওয়েলথ গেমস ২০১৭-এর দাবাতে স্বর্ণপদক এবং নেপালে ২০১৮ এর জোনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা অন্যতম।

বাংলাদেশে দাবার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার ভাবনা নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, টুর্নামেন্টের কোন বিকল্প নেই। মফস্বলে এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে হবে। সাথে মিডিয়াকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। এখনো দাবা খেলার সাফল্যগুলোকে ক্রিকেটের মত করে প্রাধান্য দিয়ে দেখানো হয় না। দাবা খেলাকেও প্রাধান্য দেওয়া হলে, একজনের সাফল্য দেখে অন্যরাও উৎসাহ পাবে এবং দাবাড়ুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে মহিলা দাবার উন্নতির জন্যে তিনি আজীবন চেষ্টা করেছেন এবং এখনো করছেন। যেখানে এফআইডিই র‍্যাঙ্কিং-এর ২০১৯ সালের সকল দাবা খেলোয়াড়ের তালিকায় মাত্র ১০.১ শতাংশ মহিলা দাবাড়ু, বাংলাদেশের অবস্থাও সেখানে খুব একটা আলাদা নয়। রানী হামিদ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যাদের মাঝে ট্যালেন্ট আছে, তাদেরকে ঠিকভাবে গ্রুমিং করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদেরকে জুড়ে দিতে হবে। মেয়েদের জন্যে একটি আবাসিকের ব্যবস্থা করা দরকার যাতে তারা খেলতে আসতে পারে চিন্তা-মুক্তভাবে।’ তিনি এখনও মহিলাদের দাবা খেলা নিয়ে আশাবাদী। আনসার এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী এতে ভূমিকা রাখছেন বলে তিনি বলেন। তাদের সহযোগিতায় দাবাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক মহিলা সদস্য যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও, বাংলাদেশ গেমসে দুইজন মহিলা দাবা খেলোয়াড় নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়াটা মেয়েদের অফিশিয়াল টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

নতুন দাবাড়ুদের উদ্দেশে তার উপদেশ জানতে চাইলে তিনি হেসে উত্তর দেন, ‘খেলতে খেলতেই দাবা খেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠা যায়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, প্র্যাকটিসের পাশাপাশি পড়াশোনাও করতে হবে দাবা খেলায় ভালো হতে হলে। ‘পজিশনাল সেন্স ভালো হতে হবে দাবা খেলার জন্যে।’ তরুণ দাবাড়ুদের জন্যে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দাবা রীতিমত যুদ্ধের মতই একটা খেলা। যখন শত্রু অ্যাটাক করতে আসছে সামনের দরজায়, তখন সৈন্য সামন্ত পিছনের দরজায় বসিয়ে রাখলে তো, শত্রুপক্ষ সব ধ্বংস করে দিবে। এই যে পজিশনাল সেন্স, এগুলোই প্র্যাকটিস এবং পড়াশোনার মাধ্যমে রপ্ত করতে হয়।’

বিশ্ব মহিলা দাবা ক্রীড়াঙ্গনে রানী হামিদের অর্জন এবং অবদানের জন্যে ২০১৮ সালের রাশিয়া দাবা ওয়ার্ল্ড কাপে তিনি মর্যাদাপূর্ণ জার্নালিস্টস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পান। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ার পাড়ি দিয়েও তিনি বাংলাদেশের সেরা মহিলা দাবাড়ু। তার ৪৪ বছরের দাবা ক্যারিয়ারের অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তার বইতে। তিনি এই বইয়ের সিংহভাগ কৃতিত্ব উৎসর্গ করেন তার প্রয়াত স্বামীকে। তিনি বলেন, স্বামীর ইচ্ছাতেই তিনি এই বইটি লেখা শুরু করেন। এখনও তিনি বইয়ের প্রতিটি নতুন সংস্করণেই দাবা-বিশ্বের নিত্যনতুন সব খেলার বিশ্লেষণ যুক্ত করেন।

পরিশেষে, কিভাবে এই বয়সে এসেও দাবা খেলায় তিনি ধৈর্য ধরে রাখতে পারেন সে ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ধৈর্য এর জন্যে তো আমি খেলি না, আমি প্রতি মুহূর্তে আনন্দ পাই দাবা খেলে। ভালো লাগে খেলতে তাই আমি খেলছি, এবং ধৈর্য বলতে যা বোঝায় তা এই ভালো লাগা থেকেই আসে।’

প্রেরণা ফাউন্ডেশনের একটি উদ্যোগ, ‘প্রেরণার কথা’র অংশ হিসেবে সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইবিএর সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর মেলিতা মেহজাবিন। ‘প্রেরণার কথা’র পুরো পর্বটি দেখা যাবে প্রেরণা ফাউন্ডেশনের ইউটিউব চ্যানেলে। সংবাদি বিজ্ঞপ্তি।

আরও পড়ুন

×