ভ্রমণ
একবার শুধু নিজেদের জন্য
উপমা মাহবুব
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ২২:০৭ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ২২:০৮
শিক্ষক বান্ধবী কাকলি মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। সেই সুযোগে চল্লিশ পেরোনো আমরা চার স্কুলবন্ধু সংসার, সন্তান আর কর্মজীবনের ব্যস্ততা পেরিয়ে হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলাম মালয়েশিয়া বেড়াতে যাব। রিল্যাক্স ট্যুর দেব। চার বান্ধবী ঘুরব, দেখব, খাব আর শপিং করব। এক ট্যুরিস্ট স্পট থেকে আরেক ট্যুরিস্ট স্পটে যাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করব না।
কিন্তু কারও সাথে কারও সময় মেলে না। বছরের তখনও ছয় মাস বাকি। অনেক কষ্টে সবার জন্য সুবিধাজনক এ রকম একটা মাত্র তারিখ মিলল। এক মাস পরেই ফ্লাইট! সেই দিনই এজেন্সি খোঁজাখুঁজি করে টিকেট বুক করা হলো। পরের দিন সবাই নিজ অফিসে কথা বলে রিস্ক নিয়ে একটু বেশি দামে ননরিফান্ডেবল টিকেট কেটে ফেললাম। যাওয়ার আগের দিনও শান্তি ছিল না। এক বান্ধবী শেষ মুহূর্তে অফিসের কাজে আটকে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সে সব সামলে নিল। গভীর রাতে বিমানবন্দরে গিয়ে আরেক বিপত্তি। ইমিগ্রেশনের সময় তাকে আলাদা করে প্রায় এক ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলো। বাইরে থেকে কোনো যোগাযোগও করা যাচ্ছিল না। আমরা উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছি, আর এদিকে বোর্ডিংয়ের ঘোষণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

থাইল্যান্ডে ট্রানজিট নিয়ে দীর্ঘযাত্রা শেষে আমরা যখন কুয়ালালামপুর পৌঁছি তখন সেখানে দুপুর। কুয়ালালামপুর দেখে দারুণ বিস্মিত হলাম। অল্প সময়ে মালয়েশিয়া দারুণ উন্নতি করেছে তা তো সবারই জানা। তবে এত আধুনিক শহর আমার প্রত্যাশার বাইরে ছিল। চকচকে রাস্তা, মেট্রোরেল, সুউচ্চ ভবন আর আধুনিক স্থাপত্য দেখে মনে হয়েছে এ যেন উন্নয়ন আর নান্দনিকতার এক যুগ্ম প্রদর্শনী। দালানগুলো ডিজাইনের দিক দিয়ে একে অন্যকে পাল্লা দিচ্ছে। এক বান্ধবী মজা করে বলল, ‘পৃথিবীর বড় বড় আর্কিটেক্ট এখানে এসে ইচ্ছেমতো সৃজশীলতার চর্চা করেন। উন্নত দেশে নানান নিয়মকানুনের কারণে ইচ্ছামতো ডিজাইনের দালান বানানোর সুযোগ নেই!’
আমাদের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেটা ছিল দুই বেডের, সুন্দর ছিমছাম এবং সাশ্রয়ী। এই ধরনের অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে রান্নাসহ ঘরের সব কাজ নিজেদের করতে হয়। মালয়েশিয়ায় ৪ নম্বরটিকে অপয়া বলে মনে করা হয়। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটি ৩৪ তলায় হলেও তাই সেটার নম্বর ছিল ৩৩এ। আমাদের বিল্ডিংটির পাশেই কেএল টাওয়ার। এটি কুয়ালালামপুরের সবচেয়ে বড় দালানের একটি। ইউনিক ডিজাইন আর রাতের আলোকসজ্জার কারণে এখানকার অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণও বটে। প্রতিদিন রাতে তাই ৩৪ (মালয়েশিয়ান রীতি অনুযায়ী ৩৩এ) তলা থেকে কেএল টাওয়ারের আলোকসজ্জা, ঝলমলে কুয়ালালামপুর শহর দেখতে দেখতে আমাদের অলস আড্ডা দারুণ জমে উঠত।
কুয়ালালামপুরে আমরা তিন রাত ছিলাম। চার বান্ধবীর আড্ডা, অল্প ঘুম আর সকালবেলার তাড়াহুড়ো আমাদের প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গিয়েছিল। সকালে সেজেগুজে, আরাম করে বের হতাম। ফিরতাম গভীর রাতে। আমরা অনেক ঘুরেছি। দুই দিন দুটো হাইল্যান্ডসে গেছি। গেংটিং হাইল্যান্ডস আর ক্যামেরন হাইল্যান্ডস দুটোই কুয়ালালামপুর থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ। আমরা যতটুকু পারি ঘুরেছি। যে স্পটগুলো কভার করতে পারিনি তা আনন্দের সাথে মেনে নিয়েছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,১০০-১,৬০০ মিটার উচ্চতার অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়ি পর্যটন অঞ্চল ক্যামেরন হাইল্যান্ডস। এটি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে মনোরম পাহাড়ি গন্তব্যস্থলগুলোর একটি। ওখানে যাওয়ার পথটা নিজেই একটি আকর্ষণ। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, গভীর সবুজ বনভূমি আর আকাশ ঢেকে থাকা নানান প্রজাতির গাছের সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছি। দারুণ সুন্দর ভারত টি স্টেট চা বাগানে পাখির মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। দুর্গম আর বিপজ্জনক পথ বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় মনোমুগ্ধকর বোহ চা বাগানে হিমশীতল হাওয়া, কুয়াশামাখা মেঘ, পাখির কিচিরমিচির আর রঙিন ফুলের সমারোহের মাঝে বসে লাঞ্চ করেছি। দেখেছি স্ট্রবেরির খামার আর সেকুলেন্ট নার্সারি।
গেন্টিং হাইল্যান্ডস পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র হিসেবে বেশি জনপ্রিয়। প্রায় ১,৮০০ মিটার পাহাড়ের উপরে কী নেই! থিম পার্ক, কেবলকার, শপিংমল– সব মিলিয়ে জমজমাট ব্যাপার। যেদিন গেন্টিং গিয়েছিলাম সেদিন আকাশ ভীষণ মেঘলা ছিল। পুরোটা সময়ই মেঘের ভেতর ঘুরে বেড়িয়েছি। থেমে থেমে বৃষ্টিও পড়েছিল। এ রকম আবহাওয়া ভ্রমণকারীদের জন্য কিছুটা বিরক্তিকর হলেও আমাদের সবকিছু দেখতেই হবে– এ রকম তাড়না ছিল না। অপূর্ব সুন্দর বনভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়ি মেঘ আর বৃষ্টি দারুণ উপভোগ করেছি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘুরে বেড়িয়েছি ফরাসি শহরের আদলে তৈরি রিসোর্ট ভিলেজে। ইউরোপীয় গ্রামের মতো দালান দিয়ে সাজানো আর মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীতে রঙিন নকল শহরটি ছবি তোলার জন্য আদর্শ জায়গাও বটে। তবে মালয়েশিয়া ভ্রমণের অন্যতম প্রিয় স্মৃতি হয়ে থাকবে গেন্টিং হাইল্যান্ডসে মেঘের ওপরের শপিংমলে ঘুরে বেড়ানো। এত্ত ওপরে যে এত আধুনিক শপিংমল থাকতে পারে আর সেখানে এত ব্র্যান্ডের দোকান থাকতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। বান্ধবীরা যখন বিভিন্ন দোকান এক্সপ্লোর করছিল, আমি শপিংমলের মাঝখানের সুন্দর বাঁধানো খোলা জায়গায় বসে মলের ভেতরে মেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরি খেলার অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। তার মানে শপিং করিনি সেটাও নয়। গেংটিংয়ের নাইকির শোরুমে দারুণ ছাড় পাওয়া যায়। জীবনে হাত দিয়েও ধরে দেখতাম না, এ রকম স্নিকার নিজের জন্য আর বরের জন্য অর্ধেকেরও কম দামে কিনে ‘আমি জিতেছি’ মুডে কুয়ালালামপুর ফিরেছি!
কুয়ালালামপুরে আমরা বিভিন্ন দেশের রেস্টুরেস্টে খাবার খেয়েছি। চমৎকার রান্না। পরিমাণ অনুযায়ী দামও রিজনেবল। শেষের দিন আমরা রাত ৩টা পর্যন্ত ঘুরেছি। নিজেদের একবারও অনিরাপদ মনে হয়নি। মুসলিম দেশ হওয়ায় পর্যটকদের পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ বেশ সংযত। রাস্তায় কেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে ঘোরে না, কোনো অসামাজিক কাজ চোখে পড়েনি। একবারই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা বেশ রাত করে চায়না মার্কেটে গিয়েছিলাম কম দামে কী পাওয়া যায় তা দেখতে। এটা আমাদের হকার্স মার্কেটের মতো। গিয়ে দেখি সব দোকানই বাংলাদেশিরা চালাচ্ছেন। চার বাঙালি মেয়ে দেখে তারা টিজ করে কথা বললেন। যা তা দাম চাইলেন। এই মানুষগুলোর জন্যই বিদেশে বাংলাদেশের এত দুর্নাম।

আবার উল্টো চিত্রও ছিল। হাইল্যান্ডসগুলোতে ঘোরার জন্য আমরা গাড়ি বুক করেছিলাম। ড্রাইভার ছিলেন বাঙালি। সজল ভাই আমাদের খুবই যত্ন নিয়েছেন। অথেনটিক মালয়েশিয়ান ব্রেকফাস্ট খেতে গ্রামের ভেতর একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেছেন। সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদের হাইল্যান্ডসগুলো থেকে নামিয়ে এনেছেন যেন অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় মেঘবৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা না থাকে।
মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছি অনেক ছবি, কিছু কেনাকাটা আর অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় বসে কফি খাওয়া, মেঘের ভেতর হাঁটা, গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা, শপিংমলে ঘুরে বেড়ানো কিংবা একসঙ্গে হাসাহাসি– সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন যেন ব্যস্ত জীবনের বাইরে অন্য এক জগতে কাটিয়েছি। ফিরে এসে মনে হয়েছে, চল্লিশ পেরিয়েও বন্ধুত্বের জন্য সময় বের করা যায়, নিজের জন্য একটু জায়গা রাখা যায়, আর জীবনকে নতুন করে উপভোগ করাও সম্ভব।
লেখক: উন্নয়ন পেশাজীবী ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- ভ্রমণ
