ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

দখলে বিপর্যস্ত কুয়াকাটা

দখলে বিপর্যস্ত কুয়াকাটা
×

কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্টের পশ্চিমে অবৈধভাবে নির্মিত দোকান - সমকাল

পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫২ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:১৫

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব-পশ্চিমে চলছে দখলের মহোৎসব। বেলাভূমি দখল করে আধাপাকা ও টিনশেড ঘর নির্মাণ করে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অনেকে কাঠ-টিন দিয়ে বানিয়েছে দোকানঘর। দখলদাররা বেলাভূমির ওই সম্পত্তি নিজেদের দাবি করে মার্কেট নির্মাণের পর লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছে। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বেড়িবাঁধের বাইরে সৈকত লাগোয়া জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ২৫টি আবাসিক হোটেল। ২০১১ সালে হাইকোর্টের ওই নির্দেশের পর পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন ২২৮টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছিল। মামলা জটিলতাসহ নানা কারণে অবৈধ স্থাপনাগুলো আজও উচ্ছেদ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কুয়াকাটার হোটেল সানরাইজের মালিক শাহজালাল সৈকতের জমিতে অর্ধশত টিনশেড ঘর তৈরি করে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নিয়েছেন। প্রতিটি দোকানঘর থেকে মাসে ভাড়া পান ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। শাহজালাল এই জমি তাদের দাবি করে বলেছেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিনিসহ মোট ৯ জনে মিলে সাত একর ১৫ শতাংশ জমি স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে কিনেছেন।

জিরো পয়েন্ট দিয়ে সৈকতে যাওয়ার ডান পাশে মার্কেট গড়ে তুলেছেন বেলাল মোল্লা। এক সময়ে ওই জমিতে কুয়াকাটা পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল। কুয়াকাটা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লা বলেছেন, বেলাল মোল্লার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে সেখানে তারা দলীয় কার্যালয় করেছিলেন। বেলাল মোল্লা সেখানে মার্কেট করায় কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেলাল মোল্লার দাবি, ওই জমি তার কেনা। তিনি অবৈধ দখলদার নন।

কুয়াকাটার সচেতন মহলের অভিযোগ, বেড়িবাঁধের বাইরে সৈকত লাগোয়া জমিতে দাঁড়িয়ে আছে সি-কুইন, তাজ, সি-প্যালেজ, সি-বিচ ইন, প্যারাডাইস ও হোটেল ক্ষেপুপাড়াসহ অন্তত ২৫টি আবাসিক হোটেল। জিরো পয়েন্টের পূর্ব পাশে আরেকটি বহুতল আবাসিক হোটেলের নির্মাণকাজ চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেছেন, বেড়িবাঁধের বাইরে সৈকত লাগোয়া কোনো জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হতে পারে না। ওই জমি পাউবোর। বহুবার দখলদারদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে নোটিশ দেওয়া হলেও তারা শোনেননি। তিনি বলেন, কুয়াকাটা সৈকতকে তার প্রাকৃতিক রূপ ফিরিয়ে দিতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা জরুরি।

কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, পর্যটকরা কুয়াকাটায় এসে স্বচ্ছন্দে সাগর দেখতে চান। অবৈধ স্থাপনার কারণে জিরো পয়েন্টের বাঁধ বা সড়কে দাঁড়িয়ে তারা সাগর দেখতে পারেন না। তাই কুয়াকাটার প্রাকৃতিক অবয়ব ধরে রাখতে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা একান্ত প্রয়োজন। তার অভিযোগ, সৈকত লাগোয়া দোকানিরা ময়লা-আবর্জনা সৈকতে ফেলছেন।

কুয়াকাটা ভ্রমণে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার গাজী মিজানুর রহমান বলেন, তিনি সপরিবারে প্রথমবার কুয়াকাটা ভ্রমণে গিয়ে হতাশ হয়েছেন। সৈকতের প্রধান অংশে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে তোলা হয়েছে রকমারি দোকানপাট। এতে প্রতিদিন অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে সৈকত। তিনি সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখতে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, কোনো অবস্থাতেই সৈকত লাগোয়া দোকানপাট থাকা উচিত নয়। সৈকত রক্ষায় প্রশাসনকে উদ্যোগী হতে হবে।

কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটার পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লাসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অবৈধ দখলদারদের তালিকা করতে। প্রকৃত দখলদারদের তালিকা হওয়ার পরই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

আরও পড়ুন

×