উদ্যোক্তা
নকশিকাঁথায় নারীদের বিপ্লব
সাজিদা ইসলাম পারুল, যশোর থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২২ | ১৪:৪৩
টানাপোড়েনের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়- এমন পরিবারে নারীর পড়ালেখা বিলাসিতা! কিন্তু দমে যাননি মরিয়ম নার্গিস। গ্রামে বসে স্বপ্ন দেখেন এবং তা বাস্তবায়নে হাতে তুলে নেন সুঁই-সুতা। কখনও ১৫ দিনে একটি শাড়ি নকশা করেন; কাঁথা করতে লেগে যায় মাস। ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। তবে ২০১১ সালে যশোর সদরে বসে মরিয়ম স্বপ্নটা বড় করেন, মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে নিজে ব্যবসা শুরু করেন। 'টুইঙ্কল ক্রাফট' ও 'যশোর নকশি' নামের প্রতিষ্ঠান থেকে এক দশকে মরিয়ম এখন সফল উদ্যোক্তা। এখন তাঁর অধীনে পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন এবং তাঁরা সবাই নারী। মাসে ৪-৫ লাখ টাকার নকশিকাঁথা ও শাড়ি বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরে এমন সাফল্যের গল্প মরিয়মের একার নয়, এই শিল্পে তাঁর মতোই অন্তত ১০ হাজার নারী উদ্যোক্তা বনে গেছেন। নকশিকাঁথায় নারী বিপ্লব বললেও অত্যুক্তি হবে না। এসব কর্মীর মধ্যে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত এমনকি বনেদি পরিবারের নারীরাও আছেন। তাঁরা বছরে ৫ লাখের বেশি নকশিকাঁথা তৈরি করছেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, যশোরে ৫০০ নকশিকাঁথা তৈরির কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ২৫ হাজার নারী বংশপরম্পরায় কাপড়, পোশাক, কাঁথা ও বিছানার চাদরে হাতের কাজের নকশা করছেন। তাঁরা সাধারণত দিনে ৬-৭ ঘণ্টা কাজ করেন। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে নকশার কাজ করছেন। স্কুলপড়ূয়া রাফিয়া আক্তার জানায়, নকশার অলঙ্করণ সে নানির কাছ থেকে শিখেছে। পড়ালেখার পাশাপাশি মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করছে।
উদ্যোক্তারা জানান, যশোরের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা দেশের চাহিদা মিটিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। অবশ্য দেশের বাজারে এখন বেড়েছে অনলাইনে বিক্রি। উদ্যোক্তা সোনিয়া আক্তার বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে পণ্য বিক্রি বেড়েছে। মাসে লাখ টাকার মতো পণ্য বিক্রি করছি। অনলাইনে পণ্য পছন্দ না হলে সরাসরি দোকানে এসে অনেকে নিচ্ছেন। মান, নকশা ও আকার ভেদে কাঁথার দাম এক হাজার থেকে ১০-১৫ হাজার টাকা।
সাফরাম বিবি প্রায় ২০ বছর কাঁথায় নকশা তুলছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিনই নতুন নতুন নারী এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন। একটু প্রশিক্ষণ ও পুঁজি পেলে তাঁরাও উদ্যোক্তা হয়ে অন্য নারীদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। নকশি রং ব্র্যান্ডের স্বত্বাধিকারী ফাতেমা খাতুন বলেন, আমাদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। নিজেরাই পণ্য সেলাই করে বিক্রি করি। সরকারি সহায়তা পেলে ব্যবসার পরিসরের সঙ্গে কর্মসংস্থানও বাড়ত।
এই শিল্পের সংকট তুলে ধরে তুহিন বুটিক হাউসের কর্ণধার শারমিন জাহান জানান, ঢাকার বিভিন্ন শোরুমের অর্ডারভিত্তিক পণ্য যশোরে তৈরি হচ্ছে। এখানে হাতেগোনা কয়েকটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের শরণাপন্ন হতে হয়। অথচ নকশিকাঁথার চাহিদা বাইরেই বেশি। কারিগরি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, নিত্যনতুন পণ্যের ডিজাইন, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্বল্পতার কারণে শিল্পটি আশানুরূপ এগোতে পারছে না।
যশোর নকশিকাঁথা অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরুজ্জামান বলেন, যশোরের নারীরা কোনো সহায়তা ছাড়াই নকশিকাঁথায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন বলা যায়। সরকারের উচিত নীতিগত সহায়তা নিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, নকশিকাঁথার কাজ নিয়ে একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। ফাউন্ডেশন থেকে নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ছাড়াও ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেতে কাজ করা হবে।
