ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মিরসরাইয়ে ড্রেজারডুবি: এখনও উদ্ধার হয়নি ৪ মরদেহ

মিরসরাইয়ে ড্রেজারডুবি: এখনও উদ্ধার হয়নি ৪ মরদেহ
×

পটুয়াখালী ও মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২২ | ১০:৫০ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২২ | ১৩:৩৬

শাহীন মোল্লা ও ইমাম মোল্লা দুই ভাই একসঙ্গে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলে সৈকত-২ নামে বালু উত্তোলনকারী একটি ড্রেজারে কাজ করতেন। গত সোমবার রাতে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ঝড়ের কবলে পড়ে ড্রেজারটি উল্টে সাগরে ডুবে যায়।

বুধবার সকালে ডুবে থাকা ড্রেজার থেকে ইমাম মোল্লার (৩০) লাশ উদ্ধার করা গেলেও উদ্ধার হয়নি তাঁর ভাইয়ের মরদেহ। শাহীনসহ আরও ৪ জনের মরদেহ ডুবে থাকা ড্রেজারের কেবিনে রয়েছে বলে দাবি স্বজনের।

লাশের অপেক্ষায় মিরসরাইয়ের সাহেরখালী ইউনিয়নের ১ নন্বর ওয়ার্ডে বসুন্ধরা ৩ নম্ব্বর প্রকল্পের সাগরপাড়ে আহাজারি করছেন স্বজনরা।

বুধবার উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠি ইউনিয়নের চর জৈনকাঠি গ্রামের আব্দুল হক মোল্লার ছেলে মাহমুদ মোল্লা, আনিচুর রহমান মোল্লার ছেলে ইমাম মোল্লা, আব্দুর রহমান ফকিরের ছেলে আল-আমিন ফকির ও সেকান্দার রাঢ়ীর ছেলে জাহিদুল রাঢ়ী। বৃহস্পতিবার সকালে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হবে। তবে এখনও ড্রেজার থেকে তারেক, শাহীন, আবুল বাশার ও আলম নামে চার শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করতে পারেননি উদ্ধারকর্মীরা। তাঁদের সবার বাড়ি জৈনকাঠি এলাকায়।

এদিকে, উদ্ধারকাজ চালাতে সাগরে জোয়ারের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। উদ্ধার কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাগরপাড়ে লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা। এনায়েত উল্যা নামে একজন অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার দু'দিন পার হয়ে গেলেও তাঁরা স্বজনের লাশ পাননি। ফায়ার সার্ভিস কিংবা ডুবুরি দলের কর্মীরা ডুবে থাকা ড্রেজারের কাছে গেলেও কেবিন থেকে লাশ উদ্ধারে কোনো চেষ্টা করছেন না। উদ্ধার হওয়া চারটি লাশই স্বজন ও কোস্টগার্ডের কর্মীরা ড্রেজার থেকে উদ্ধার করেছেন।

সাগরে গিয়ে দেখা গেছে, ডুবে যাওয়া ড্রেজারটি টেনে মাটি থেকে ওপরে তুলতে বুধবার সকাল থেকে তিনটি টাগবোট (ছোট ক্রেন) কাজে লাগানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে সাগরে জোয়ার এলে তিনটি এপক্যাভেটর দিয়ে ড্রেজারটি টেনে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এপক্যাভেটর দিয়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনটি টাগবোট সকাল থেকে কাজে লাগানো হয়েছে।

এদিকে একই বাড়ির চার সন্তানকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠি গ্রামের মোল্লাবাড়ি। স্বজনদের আহাজারি ও আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে এ বাড়ি। পুরো বাড়িতে এখন মাতম। একই অবস্থা এ গ্রামের সরদারবাড়ি, ফকিরবাড়ি, হাওলাদারবাড়ি ও রাঢ়ীবাড়িতে। সেখানেও চলছে সন্তানহারা বাবা-মাসহ স্বজনদের আহাজারি, বুকফাটা আর্তনাদ।

হাসিনা বেগমের নিখোঁজ দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে ইমাম মোল্লার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ অপর ছেলে শাহীন মোল্লা। দুই ছেলেকে হারিয়ে মা হাসিনা বেগম পাগলপ্রায়। তিনি বলেন, 'আমার বাবারা আমারে ছাইর‌্যা বুকটা খালি কইর‌্যা চইল্যা গেল! আমি অ্যাহোন কারে লইয়া বাঁচমু? ওরে বাবা গো, তোরা আমার বুকে আয়। আমারেও লইয়া যা তোরা।'

মাহমুদ মোল্লার বাবা আব্দুল হক মোল্লা বলেন, 'আমার বুকটা আইজ খালি হইয়া গেল। আমি কারে লইয়া বাঁচমু? বাবা, তুই আমারে ছাইড়া গেলি ক্যান? আমি ক্যামনে চলমু?'

উদ্ধারকাজে তদারকি করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান। তিনি জানান, সাগরে জোয়ার না থাকলে উদ্ধারকাজে ব্যবহূত টাগবোটগুলো সাগরে অবস্থান করতে পারে না। টাগবোটগুলো সাগরে অবস্থান করতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি প্রয়োজন। না হলে সেগুলোও বালুতে আটকে যায়। তাই জোয়ার আসা পর্যন্ত উদ্ধারকাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফিন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ইমাম হোসেন পাটোয়ারী জানান, তাঁরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন ড্রেজারের ভেতরে আটকে থাকাদের লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু ড্রেজারটি মাটির নিচ থেকে টেনে ওপরে তুলতে না পারলে ড্রেজারের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না ডুবুরি দলের কর্মীরা। এ ছাড়া সাগরে জোয়ারের সময় স্রোতের কারণেও বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারছেন না ডুবুরিরা।

আরও পড়ুন

×