বরিশালে গুজব ছড়িয়ে হাসপাতাল থেকে তাড়ানো হচ্ছে রোগী
ফাইল ছবি
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ১০:১৭
'হাসপাতালে করোনা রোগী এসেছে, আপনারা সকলে সতর্ক হোন'- বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে বহির্বিভাগের বারান্দায় সোমবার সকাল ৯টার দিকে হ্যান্ডমাইকে হঠাৎ এমন ঘোষণা দিচ্ছিলেন এক কর্মচারী। ফলে বহির্বিভাগে আসা রোগী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
এ সময় সেখানে উপস্থিত এক সংবাদকর্মী বিষয়টি জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনকে মোবাইল ফোনে কল করেন। পরিচালক দ্রুত ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালামকে কল দিয়ে এ ঘোষণা বন্ধ রেখে রোগী ও দর্শনার্থীদের করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কবার্তা প্রচারের নির্দেশ দেন।
পরে জানা যায়, রোগী ও দর্শনার্থী তাড়াতে কর্মচারীরা এমন মিথ্যা প্রচারের কৌশল নিয়েছেন। যদিও করোনাভাইরাস আতঙ্কে দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল শেবাচিম হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অর্ধেক নেমেছে। যারা নিরুপায় হয়ে আসছেন তাদেরও মিথ্যা প্রচার চালিয়ে হাসপাতাল থেকে তাড়ানো হচ্ছে। শুধু শেবাচিম হাসপাতাল নয়, চিকিৎসাসেবায় স্থবিরতা নেমে এসেছে গোটা নগরীতে। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন দায়সারাভাবে। প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ প্রায় সব শ্রেণির চিকিৎসক। করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসকদের এমন সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
হাসপাতালের নার্স তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা বেগম বলেন, ১০০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৭০০ রোগী ভর্তি থাকতেন। করোনাভাইরাস আতঙ্কের পর নতুন রোগী আসা কমে গেছে, কিছুটা সুস্থ রোগী যারা ছিলেন তারাও আতঙ্কে দ্রুত হাসপাতাল ছেড়েছেন।
নিচতলায় বহির্বিভাগে হাতেগোনা কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে। বেশিরভাগ কক্ষে চিকিৎসক অনুপস্থিত। একাধিক রোগী জানান, চিকিৎসকরা রোগীদের দূরে দাঁড় করিয়ে ২-১টি কথা শুনে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন অথবা মোবাইল ফোন নম্বর দিচ্ছেন পরে যোগাযোগ করে ব্যবস্থাপত্র নেওয়ার জন্য।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, আতঙ্কে রোগী আসা অর্ধেক কমে গেছে। একই কারণে চিকিৎসকরাও রোগী দেখতে কিছুটা অনীহা দেখাচ্ছেন। এ জন্য ফোনে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য একটি হটলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। গতকাল সকালে করোনা রোগী আসার খবর ছড়ানো ভুল বোঝাবুঝি বলে পরিচালক জানান।
প্রাইভেট চিকিৎসা বন্ধ: বরিশাল নগরীতে ল্যাবএইড, মেডিনোভা, অ্যাপোলো, বেলভিউ নামক ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে বসেন বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে আরও অনেক চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। সকাল ১০টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চিকিৎসদের চেম্বার অধ্যুষিত এলাকাগুলো থাকে লোকারণ্য। গত শনিবার থেকে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসকরা চেম্বারে আসা বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
ডায়াগনস্টিকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেশিরভাগের বয়স ষাটোর্ধ্ব। তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজেরাই হৃদরোগী। বাইপাস অপারেশনও হয়েছে দু'একজনের। জীবনের ঝুঁকি এড়াতে তারা আপাতত চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ রেখেছেন। বরিশাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মফিজুল ইসলাম কামাল বলেন, চিকিৎসকরা নিরাপত্তার জন্য চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করেছেন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ঢাকা থেকে সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাওয়া গেলে চিকিৎসকদের আবার চেম্বারে ফিরিয়ে আনা হবে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রোগী দেখা না দেখা চিকিৎসকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তাছাড়া চিকিৎসকের নিরাপত্তার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তেমন পদক্ষেপও নেওয়া যায়নি। জরুরি রোগীদের সরকারি হাসপাতাল এবং প্রয়োজনে হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করার পরমর্শ দেন তিনি।
- বিষয় :
- করোনার প্রাদুর্ভাব
- বরিশাল
- শেবাচিম হাসপাতাল
