ফুল খাচ্ছে এখন গরু-ছাগলে
ক্ষেত থেকে ফুলগাছ তুলে ফেলছেন কৃষকরা -সমকাল
জামির হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:০৪ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:১১
তিন বিঘা জমিতে গাঁদা, রজনীগন্ধা ও গ্লাডিয়াস ফুলের চাষ করেছিলেন কৃষক আনোয়ার হোসেন। দু’সপ্তাহ হলো ফুল বেচাকেনা বন্ধ। ফলে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে ফুল। এদিকে ফুল তুলে ফেলে না দিলে গাছ মরে যাবে। তাই গাছ থেকে একবার ফুল তুলে ফেলে দিতে প্রায় চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দু’সপ্তাহে দু’বার ক্ষেত থেকে ফুল তুলে ফেলে দিয়েছেন। তুলে ফেলা সেসব ফুল এখন গরু-ছাগলকে খাওয়ানো হচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন জানালেন, এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে। এ ভাইরাসের কারণে সারাদেশে চলছে অঘোষিত লকডাউন। ফলে দেশের সব ফুলের বাজার বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এ বছর দুই লক্ষাধিক টাক খরচ করে ফুলচাষ করেছিলাম। করোনার কারণে সবই মাটি হয়ে গেল।
একই রকম অবস্থা জেলার হাজার হাজার ফুলচাষির। এবছর ঝিনাইদহের ছয় উপজেলায় ২০৪ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়েছিল। গত বছর এ জেলায় ফুলচাষ হয়েছিল ২৪৫ হেক্টর জমিতে। প্রতিবছর সব থেকে বেশি ফুলের চাষ হয় জেলার সদর উপজেলার গান্না ও কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে।
স্থানীয়রা জানায়, ১৯৯১ সালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের সৌখিন কৃষক ছব্দুল শেখ সর্বপ্রথম ফুলচাষ করেন। ওই বছর মাত্র ১৭ শতক জমিতে ফুল চাষ করে ৩৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জাতের ফুল চাষের বিস্তার লাভ করতে থাকে। সেখান থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে জেলার হাজার হাজার কৃষক ফুলচাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ফুলচাষি ও ফুলকর্মীদের লাভের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। গত ২৩ মার্চ থেকে ফুলের বাজার বন্ধ। প্রতিবছর জেলার ফুলচাষিরা বসন্ত বরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং বাংলা নর্ববর্ষ উদযাপনসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে ফুলের যোগান দিয়ে থাকেন। এ সময়ে ভালো লাভ পান কৃষকরা। এবছর স্বাধীনতা দিবসের আগে থেকে ফুল বেচাকেনা বন্ধ। এখনো সামনে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। কিন্তু কৃষকের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। ফুল বেচাকেনা না থাকায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন স্বাম্ভানাময় ফুলচাষের সঙ্গে জড়িতরা। বেশি বিপদে পড়েছেন ফুলকর্মীরা, যারা ফুল তোলা ও গাঁথার কাজ করে সংসারের খরচ যোগান দিতেন।
সবচেয়ে বেশি ফুলচাষ হওয়া এলকা বালিয়াডাঙ্গা ও গান্না ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা পকেটের টাকা খরচ করে ক্ষেত থেকে ফুল তুলে ফেলে দিচ্ছেন। অনেকে ফুল গবাদি পশুর খাবার হিসাবে ব্যবহার করছেন। অনেক স্থানে দেখা গেলো কৃষকরা ফুলসহ গাছ তুলে ফেলে দিচ্ছে। ক’দিন আগে মাঠের পর মাঠ দোল খাচ্ছিল লিলিয়াম, গাঁদা, রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ ও গ্লাডিয়াসসহ নানা জাতের ফুল। ক’দিন আগেও এসব এলকার কৃষকরা ফুলের রঙে রঙিন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। তারা এখন জানালেন ফুল নিয়ে চরম হতাশা আর দুঃস্বপ্নের কথা।
কালীগঞ্জ উপজেলার শাহপুর ঘিঘাটি গ্রামের স্কুল শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, এবছর আট বিঘা জমিতে ফুলচাষ করেছিলাম। অনেক জমিতে ফুল তোলা শুরু হয়েছিল। এখন ফুল বেচাকেনা বন্ধ। জমিতে ফুল পচে নষ্ট হচ্ছে। কিছু ফুল বাড়ির গবাদি পশুকে খাওয়াচ্ছি। অনেক জমির ফুল গাছ তুলে দিচ্ছি।
তিনি জানান, ক’দিন আগেও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বালিয়াডাঙ্গা, লাউতলা ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্টান্ড দুপুর গড়ালে ফুলে ফুলে ভরে যেত। এসব বাজারে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ফুল কিনতে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আসতেন। ফুলচাষি, ব্যাপরী আর ফুলকর্মীদের হাকডাকে মুখরিত থাকতো বাজার। সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটের বাসের ছাদে স্তুপ করে সাজানো হতো ফুল। ঢাকা-চট্রগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে ট্রাক-পিকআপ ও ভ্যান ভরে ফুল যেত। সেখানে এখন আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। একই রকম অবস্থা জেলার বড় ফুলের হাট গান্না বাজারের।
সদর উপজেলার গান্না বাজার ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দাউদ হোসেন জানালেন, ফুলের ভরা মৌসুমে করোনার হানায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কবে নাগাদ ফুলের বেচাকেনা শুরু হবে তাও অনিশ্চিত। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ফুল গরু ছাগল দিয়ে খাওয়াচ্ছেন।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক কৃপাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, করোনাভাইরাসের কারণে ফুলচাষিরা চরম বিপদে পড়েছেন। তারা ফুল বিক্রি করতে পারছেন না। আবার ক্ষেতে ফুল রাখতেও পারছেন না। বাধ্য হয়ে গরু ছাগল দিয়ে খাওয়াচ্ছে। ফুলচাষ দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখলেও দ্রুত পঁচনশীল হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
