নতুন পোশাক রইল পড়ে, কাফনে বিদায়
হাফিজুলের জন্য কেনা নতুন পোশাক ও তার ছবি নিয়ে কান্নারত দুই বোন। পাশে বাবা গোলাম খবির হাওলাদার। শনিবার হাফিজুলদের বাড়িতে সমকাল
বরগুনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
একমাত্র ভাই হাফিজুলকে নতুন পোশাকে সাজাবেন। তাই মোবাইল ফোনে ভিডিও কল দিয়ে হাফিজুলের পছন্দ অনুযায়ী কিনেছেন শার্ট, প্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা, গেঞ্জি। এসব নতুন পোশাক দেখে খুশিতে আত্মহারা ভাই। ঢাকা থেকে পোশাক কিনে এনেছেন বোন। কিন্তু যার জন্য এ পোশাক, সে শিশুটিই পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের সাদা কাপড় পরে শুয়ে আছে।
প্রতিবেশী এক নারীকে তাঁর ভগ্নিপতি ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে হত্যা করে। খুন করা হয় ওই নারীর কন্যাশিশুকেও। গত বৃহস্পতিবার রাতে বরগুনা সদর উপজেলার গুদিঘাটা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।শনিবার দুপুরে বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা-পাতাকাটা গ্রামের সোনার বাংলা গ্রামে গেলে দূর থেকেই শোনা যায় কান্নার শব্দ। যে বাড়ি থেকে কান্না ভেসে আসছিল, সেটি হাফিজুলদের। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নতুন পোশাক ও হাফিজুলের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন রিমা ও রুমা নামে তার দুই বড় বোন। পাশেই নির্বাক বসে আছেন বাবা খবির হাওলাদার। আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়েও থামাতে পারছেন না হাফিজুলের বোনদের ডুকরে ওঠা কান্না।
বড় বোন রিমা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় বসে ছোট ভাই হাফিজুলের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনতে বাজারে যাই। এরপর মোবাইল ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে হাফিজুলের পছন্দমতো তিনটি প্যান্ট, দুটি শার্ট, দুটি গেঞ্জি, একটি লুঙ্গি আর একটি গামছা কিনে ওকে দেখাই। নতুন জামা-কাপড় দেখে খুবই খুশি হয় হাফিজুল। জানতে চাই নতুন জুতা কিনবে কিনা? আমি বলেছি, বরগুনা থেকে নতুন জুতা কিনে দেব। তখন হাফিজুল খুশিতে মোবাইল ফোন নিয়ে খালার কাছে (যেখানে থাকত) দেয় এবং বলে, খালা দেখো আমার জন্য কতগুলো নতুন পোশাক কিনেছে। তখন খালা দেখে মজা করে বলেন, এতগুলো নতুন পোশাক দিয়ে তো ওকে বিয়ে করানো যাবে।’ এ কথা বলতে বলতে রিমা প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন। একটু পর ধাতস্থ হন রিমা। ফুসে ওঠেন ক্ষোভে– ‘আমরা আগেই ইলিয়াসের ফাঁসি চাই না, ওরে আগে পিটাইতে হবে, তারপর কোপাইতে হবে, এরপর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারতে হবে।’ তিনি বলেন, কেন হাফিজুলকে নেওয়া হলো ওই বাড়িতে এবং কেনই বা তাকে হত্যা করা হলো, সেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
কথা হয় হাফিজুলের বাবার সঙ্গে। জানালেন বাড়িতে আট শতাংশ জমি ছাড়া কিছুই নেই তাঁর। জীবিকার তাগিদে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় বসবাস করেন তিনি। নিজে এবং স্ত্রী দু’জনেই করেন শ্রমিকের কাজ। একমাত্র ছেলেকে শিক্ষিত করতে রেখে গেছেন খালার বাড়িতে।
হাফিজুল রোডপাড়া শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল। তার রোল নম্বর ছিল এক। ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওহিদুজ্জামান বলেন, ‘হাফিজুল বৃহস্পতিবারও স্কুলে আমরা ওর হত্যার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
নিহত কন্যাশিশুটিকে দেখতে হাসপাতাল মর্গে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার দাদি, ফুফুসহ আত্মীয়স্বজন। এ সময় শিশুটির ফুফু বলেন, তারা অনেক চেষ্টা করেছেন ভাই এবং ভাবির বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য। নিষ্পত্তির কথাও ছিল। এ সময় ভাইয়ের মেয়ের নানা স্মৃতি স্মরণ করে কান্নায় লুটিয়ে পড়েন তিনি।
বরগুনা থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় হামলার শিকার ওই নারীর ভাই মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার ইলিয়াস আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে তিন বছরের শিশুকন্যা ও প্রতিবেশী শিশু হাফিজুলকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন ওই নারী। গভীর রাতে ইলিয়াস পাহলান তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এতে বাধা দিলে দা দিয়ে দুই শিশু ও শ্যালিকাকে কুপিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই হাফিজুল মারা যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে কন্যাশিশুটির মৃত্যু হয়।
