সরেজমিন: শিবচর
লকডাউন মানে লকডাউন
ফাইল ছবি
সোহেব আহমেদ ও মোহাম্মদ আলী মৃধা, শিবচর (মাদারীপুর) থেকে
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২০ | ২৩:০০ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২০ | ২৩:১৬
করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মাদারীপুরের শিবচরে চলছে কঠোর লকডাউন। দেশের সর্বপ্রথম লকডাউন ঘোষিত এ উপজেলার বাসিন্দা বেশিরভাগই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। অতি প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও সবাই মাস্ক পরছেন; মেনে চলছেন সামাজিক দূরত্ব। হাট-বাজার চালু রাখা হচ্ছে দিনের নির্দিষ্ট ভাগে ও সীমিত সময়ের জন্য। এলাকার কৃষক, দিনমজুর, ভ্যান-রিকশাওয়ালাসহ শ্রমজীবী ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়লেও নিজেদের সুরক্ষায় মেনে চলছেন এ 'বন্দিদশা'। স্থানীয় প্রশাসনও নির্দেশিত বিধিনিষেধ রক্ষায় তৎপর। উপজেলার আনাচে-কানাচে চলছে নিয়মিত পুলিশ ও সেনা টহল। লোকজনের সচেতনতা বাড়াতে গ্রাম পুলিশের সদস্যরা মাইকিং করছেন। এদিকে রাজধানীসহ আশপাশের জেলা থেকে শিবচরে প্রবেশের অন্যতম পথ শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে যাত্রীসমাগম ঠেকাতে নৌপুলিশের বেশ কয়েকটি দল পদ্মা নদীতে তৎপর।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, লকডাউন পরিস্থিতি মেনে রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কঠোরভাবে। উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্পটে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। এলাকার বাসিন্দারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে চলছেন লকডাউনের বিধিনিষেধ ও সামাজিক দূরত্ব।
স্থানীয়রা জানান, মানুষ যাতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে না পড়েন, সেজন্য সকালের বাজারগুলো তিন ঘণ্টা খোলা রাখা হচ্ছে। আর সাপ্তাহিক হাট বিশেষ করে পদ্মা নদীতীরে রোববার ও বৃহস্পতিবার বসা মাদবরহাট, আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে বসা মঙ্গলবারের উৎরাইল হাট, উমেদপুর ইউনিয়নে শনিবার বসা চান্দেরচর হাট নির্দিষ্ট দিনে খোলা রাখা হচ্ছে দুপুর ২টা পর্যন্ত। গ্রামাঞ্চলের মুদি দোকান সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
শিবচরের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাঁচ্চর বাজারে গতকাল শনিবার সকালে শাকসবজি কিনতে এসেছিলেন রাজারচরের রানা মোল্লা। তিনি জানান, এলাকার বেশিরভাগ বাজারই বন্ধ। দৈনিক কাঁচাবাজার সকালে দুই-তিন ঘণ্টার জন্য খোলা রাখা হচ্ছে। সবাই তাড়াহুড়া করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। করোনা আক্রান্তের ভয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি কম করছেন মানুষ।
সরেজমিন দেখা যায়, পাঁচ্চর মোড়ে কয়েকশ' দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বিকাশের দোকান ও একটি ওষুধের দোকান খোলা। রাস্তার অন্যপাশে খোলা দুটি ফলের দোকান। এসব দোকানের সামনে ক্রেতারা যাতে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে কিনতে পারেন, সেজন্য দাগ কেটে রাখা হয়েছে। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে কাছেই শামিয়ানা টানিয়ে অবস্থান নিয়েছে পুলিশের একটি দল।
ফল কিনতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা নূরে আলম বলেন, লোকজন বেশি নেই। তারপরও যারা আসছেন, নির্দিষ্ট দাগে দাঁড়িয়ে একজন একজন করে কিনছেন।
শিবচর পৌর শহরের শেখ হাসিনা সড়কের বাসিন্দা ব্যাংকার মনিরুজ্জামান মিন্টু জানান, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে তাকে অফিসে যেতে হচ্ছে। নিজে মাস্ক ব্যবহার করলেও শঙ্কিত থাকেন সব সময়। তিনি বলেন, ভয় হয় নিজের দুটি ছোট বাচ্চাকে নিয়ে। আমি বাইরে যাই, অফিস শেষে বাসায় ফিরি। আমি আক্রান্ত হলে ঘরের ছোট বাচ্চা, বৃদ্ধ মাও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই ভয়ে ভয়ে থাকি।
বহেরাতলা ইউনিয়নের বাসিন্দা ইব্রাহিম জানান, এ এলাকায় প্রবাসী লোকজন বেশি থাকায় পুলিশের তৎপরতাও বেশি। তিনি বলেন, আমি নিজেই এক সপ্তাহ ধরে বাড়ির বাইরে যাইনি।
স্থানীয় সাংবাদিক নাসির আহমেদ বলেন, শিবচরে কঠোর লকডাউন চলছে শুরু থেকেই। এ জন্যই হয়তো এ এলাকায় ভাইরাসটির সংক্রমণ অনেকটা এড়ানো গেছে। এ আসনের এমপি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটনের প্রত্যক্ষ মনিটরিংয়ে উপজেলাবাসী লকডাউন পরিস্থিতিতে সহায়তা করছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন খান সমকালকে বলেন, শিবচরে লকডাউনের পর থেকে সাধারণ মানুষ সরকারের নির্দেশনা মেনে সতর্কতার মাধ্যমে নিজ নিজ বাড়িতে থাকায় বর্তমানে করোনা ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, লকডাউনের পর থেকে কঠোর নজরদারিতে রয়েছে উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। এ উপজেলায় ৯০ শতাংশ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরের মধ্যেই থাকছেন। মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ জরুরি সেবা ও ওষুধপত্রের জন্য বাইরে বেরুচ্ছেন।
মাদারীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল শিবচর) আবির হোসেন জানান, উপজেলাজুড়ে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশের টহল জোরদার রয়েছে। জনসমাগম ঠেকাতে শিবচর উপজেলার ১৭টি প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর, যাতে বহিরাগতরা প্রবেশ করতে না পারে।
