বালুঘাট নিয়ে দ্বন্দ্বে ব্যবসায়ীকে পিটুনি, চার বাড়িতে গুলি
ছবি: সংগৃহীত
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০০:১৩
বালুঘাটে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আরিফুল ইসলাম (৪৩) নামে এক ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পরে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের লালনবাজারে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার আধাঘণ্টা পর আরিফুল, তাঁর বড় ভাই রবিউল ইসলাম, চাচাতো ভাই সামছুল ইসলামের বাড়িতে গুলি ছোড়া হয়। রাত দেড়টার দিকে যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন আলীর বাড়িতে গুলিবর্ষণের পর ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে দেখা যায়, আতঙ্কে লালনবাজার এলাকার অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। পড়ে আছে গুলির খোসা।
আহত আরিফুলের ভাতিজা মাহবুবুল হাসান রনি বলেন, ‘সুজন, রিপন, রিশানসহ অনেকেই রাতে হঠাৎ চাচার ওপর হামলা চালায়। তারা লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে ফাঁকা গুলি ছুড়ে চলে যায়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৩ সালে এলংগী আচার্য মৌজায় গড়াই নদী খনন করে তোলা ৭০ হাজার হাজার ঘনফুট বালু সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৭০ লাখ টাকায় ইজারা দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ওই টাকা কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে দরপত্রের মাধ্যমে বালু অপসারণের দায়িত্ব পায় কুষ্টিয়ার সৈকত এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতন ও যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ঠিকাদার বালু সরাতে পারছিলেন না। সম্প্রতি ঠিকাদারের যোগসাজশে ও উপজেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের সহায়তায় সাবেক কলেজ ছাত্রদল নেতা সুজন হোসেন, যদুবয়রা ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রিপন হোসেনের নেতৃত্বে বালু সরানো শুরু হয়। নির্দিষ্ট টাকা দেওয়ার শর্তে ইটভাটা ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম তাঁর জমির ওপর দিয়ে বালুবাহী ট্রাক চলাচলের অনুমতি দেন।
কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা দেওয়ার শর্তে আমার ভাটার ওপর দিয়ে বালুর গাড়ি চলাচল করে। ঘাটে আমার একটি ভেকুও চলে। ঘাটের কাছে কিছু টাকা পাওনা আছে। গত শুক্রবার সকালে টাকা চাইতে গিয়ে বিএনপি নেতাদের নিয়ে ইয়ার্কি করেছিলাম। হয়তো সেজন্যই রাতে সুজন ও রিশানেরা হামলা চালিয়েছে।’
এলাকার কয়েকটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি বালুর ঘাটটি ঠিকাদারের কাছ থেকে চুক্তি করে দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছিলেন যদুবয়রা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন আলী। এ নিয়ে গত শুক্রবার সকালে বালুঘাটের কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রদল নেতা সুজনের সঙ্গে তাঁর হাতাহাতি হয়। এসব নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। এর মধ্যে শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে রিপন আলীর বাড়িতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার পর ভাঙচুর করা হয়।
রিপন আলীর বাড়ির গেট, সিসিটিভি জানালার গ্লাস ভাঙা দেখা গেছে। রিপন আলী বলেন, বালুঘাটকে কেন্দ্র একজন বড় বিএনপি নেতার নির্দেশে বাড়িতে হামলা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা ভাঙচুর চালিয়ে অন্তত ২০-২৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছে। এ ছাড়া একটি মোটরসাইকেলও তারা নিয়ে গেছে। এ বিষয়ে থানায় মামলা করা হবে।
স্থানীয় মুদি দোকানি জহুরুল ইসলাম বলেন, বালুর ঘাট নিয়ে প্রায় হামলা ও গোলাগুলি হয়। গত শুক্রবার রাতেও গুলি করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। তিনি ওই বালুর ঘাট বন্ধের দাবি জানান।
এদিকে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে আসা আগ্নেয়াস্ত্রধারীরা মহড়া দিচ্ছেন। মুখবাঁধা কয়েকজনকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে শোনা যায়।
শনিবার দুপুরে হাঁসদিয়া গ্রামে গিয়ে রবিউল ইসলামের বাড়ির প্রবেশপথের দেওয়ালে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র দেখা গেছে। রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে বাজারে আমার ছোট ভাইকে মারেছে। পরে বাড়িতে এসে ৮-১০টা গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। সিসিটিভিতে সব দেখা যাচ্ছে। থানায় মামলা করব।’
এলংগী মৌজায় আহত আরিফুলের ইটের ভাটার ওপর দিয়ে বালুবাহী যানবাহন গতকাল দুপুরেও চলাচল করতে দেখা গেছে। এ সময় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সৈকত এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক অনু শেখ বলেন, বিভিন্ন কারণে ঘাট বন্ধ ছিল। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পারসেন্ট ভাগ করে ২০-২৫ দিন হলো ঘাট চলছে। কারা হামলা ও গুলি করেছে তা জানা নেই। তিনি দাবি করেন, প্রতিদিন আরিফুলদের পাওনা ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করে আসছেন।
বক্তব্য জানতে ছাত্রদল নেতা সুজন হোসেনকে পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন যদুবয়রা ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রিপন হোসেন। তাঁর ভাষ্য, ঘাট বৈধভাবে চালানো হচ্ছে। তবে কারা কেন হামলা চালিয়েছেন, তা জানা নেই।
বালুঘাট, হামলা বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, এসবে কারা জড়িত প্রশাসন তা খুঁজে বের করুক।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ঘটনা জেনেছেন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
