টাকা ছাড়া কাজ হয় না ভূমি অফিসে
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও চাহিদামতো ঘুষ না দিলে কাগজপত্র গ্রহণই করা হয় না। এ ছাড়া চাহিদামতো টাকা না দিলে সরকারি খাসজমিও নিয়মমাফিক বন্দোবস্ত দেওয়া হয় না। টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না এই বহুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী নিজেকে টাঙ্গাইল জেলা উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের সভাপতি দাবি করেন। তিনি সেবাগ্রহীতাদের বলেন, ‘টাকা দিলে ছেঁড়া দলিলেও কাজ হবে। টাকা না দিলে কাগজপত্র নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখতে বলেন।’অভিযোগ রয়েছে, বহুরিয়া গ্রামের কৃষক জুলহাস মিয়া ১৪০ শতাংশ জমির নামজারি (খারিজ) করতে যান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। এ জন্য উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। জুলহাস ১০ হাজার টাকা দিতে চাইলে ফরহাদ আলী দাবি করা ৩০ হাজার টাকার কমে খারিজের আবেদন গ্রহণ করেননি। এত টাকা না থাকার কথা জানিয়ে ওই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাকে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি আবেদন গ্রহণ করেননি। এ সময় উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী বলেন, ‘৩০ হাজার টাকা দিলে খারিজ হবে, না দিলে কাগজপত্র নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখেন।’ সভাপতি হিসেবে তিনি যেভাবে কাজ করে দেবেন, সেটাই টাঙ্গাইল জেলার নিয়ম বলে জুলহাস মিয়াকে জানান ওই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা।
বহুরিয়া ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তারা মিয়া বলেন, তাঁর ২ শতাংশ বসতবাড়ির নামজারি (খারিজ) করতে গেলে ওই উপসহকারী ভূমি কমকর্তা ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। বলেন, টাকা দিলে এক মাসের মধ্যে খারিজ হয়ে যাবে। অনেক কষ্ট করে চাহিদামতো ১০ হাজার টাকা উপসহকারী কর্মকর্তাকে দেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত কিছু টাকা দাবি করে খারিজ না দিয়ে তাঁকে ঘোরাতে থাকেন। পরে বহুরিয়া গ্রামের তাঁর এক আত্মীয়কে নিয়ে ভূমি অফিসে গিয়ে টাকা ফেরত চান। কিন্তু টাকা ফেরত না দিয়ে রাগারাগি করে ১৫ দিন আগে খারিজ দেন।
জানা গেছে, বহুরিয়া ভূমি অফিসের পশ্চিম পাশে ১৫ শতাংশ জমিতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়িতে বসবাস করেন আমজাদ সিকদার, আজাবর সিকদার ও তাঁর ভাতিজা শাকিল সিকদার। বিএস পর্চায় ওই বাড়ির জমি সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী, তাঁর স্থানীয় দালাল সানোয়ার হোসেন ও তাঁর বন্ধু আমজাদ হোসেন তাদের কাছে ৩ লাখ টাকা দাবি করেন। এ টাকা দিলে বাড়ির জমি তাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে বলে জানান। পরে চাহিদামতো টাকা দেওয়ায় আমজাদ সিকদার ও তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগমের নামে ৫ শতাংশ ও ভাতিজা শাকিল সিকদার এবং তাঁর স্ত্রী তাহমিনার নামে ৫ শতাংশ জমি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু দরিদ্র আজাবর সিকদার চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তাঁর ৫ শতাংশ জমি খাস হিসেবেই রয়ে গেছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি। চাহিদামতো টাকা দিয়ে জমি বন্দোবস্ত পেয়েছেন বলে জানান আমজাদ হোসেন।
বহুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তিন তিনবারের ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান মিয়ার ভাষ্য, ওই অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার চিহ্নিত কয়েকজন দালাল রয়েছে। কাগজপত্র সঠিক থাকলেও সঠিক নেই বলে দালালদের কাছে পাঠান। পরে চাহিদামতো টাকা পাওয়ার পর তিনি কাজ করে থাকেন।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বহুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী। তিনি বলেন, কাগজপত্র সঠিক থাকলে তাঁর অফিসে কোনো টাকাপয়সা লাগে না। তাঁর অফিসে কোনো দালাল নেই।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুচী রানী সাহা বলেন, ওই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেউ লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ করেনি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
