রং ও সুতার দামে স্বপ্ন মলিন
মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
একসময় ভোরের আলো ফোটার আগেই তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত কুমারখালীর তাঁতপল্লি। শোনা যেত শুধু মাকু আর শানার ঠোকাঠুকির
শব্দ। কয়েক বছরের পাল্টে গেছে এ চিত্র। রং-সুতাসহ কাঁচামালের দাম বেড়ে উৎপাদনে ধস নেমেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাঁত কারখানা। মলিন হয়ে যাচ্ছে তাঁতিদের স্বপ্ন।তাঁতি ও তাঁত জরিপে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে উপজেলায় তাঁতির সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। পৌরসভার কারিগরপাড়া ৭০ থেকে ৮০ পরিবারের প্রধান পেশা ছিল তাঁত ও তাঁতজাত পণ্য উৎপাদন। এখন মাত্র ৮ থেকে ১০ পরিবার এ পেশায় জড়িত। রং-সুতাসহ কাঁচামালের দাম বাড়ায় গত তিন বছরে তাঁতির সংখ্যা কমেছে দুই হাজারের বেশি।
কুমারখালী মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ৪০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা ১৭৫ টাকা, ৫০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড ২০০ টাকা এবং ৬০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। ২০১৯ সালে ৫০ থেকে ৭০ টাকা কমে পাওয়া যেত। প্রতি কেজি রং বিক্রি হতো প্রায় তিন হাজার টাকা। কয়েক দফা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়।
অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, কয়েক বছরের সুতা-রংসহ কাঁচামালের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেই তুলনায় লুঙি-গামছার দাম বাড়েনি। লোকসান গুনতে গুনতে পুঁজি হারিয়েছেন তাঁতিরা। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে অনেকেই পেশা বদলেছেন।
কথা হয় কারিগরপাড়ার ষাটোর্ধ্ব মো. আতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে হাত চরকায় কাজ করছি। রং-সুতাসহ সবকিছুর দাম দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু লুঙি-গামছার দাম বাড়েনি। এ কারণে এক সময়ের জমজমাট এ পেশা এখন ঐতিহ্য হারাচ্ছে। অন্য কাজের অভ্যাস নেই। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে এখনও কাজ করে যাচ্ছি।
আতিয়ার রহমানের স্ত্রী আয়েশা খাতুন জানান, করোনাকালে ব্যাপক লোকসান হয়েছে। পুঁজি কম থাকায় এখন গামছা তৈরির কাজ করছেন তারা। একই এলাকার আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়িতে দুইখান তাঁত ছিল। লোকসান হওয়ায় সেগুলো বিক্রি করে দেনা শোধ করেছি। এখন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছি।’
একই কারণে তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা কমেছে যদুবয়রা ইউনিয়নের যদুবয়রা পুরাতন বাজার ও স্কুলপাড়ার। একসময় সেখানে শতাধিক তাঁতি পরিবার ছিল।
যদুবয়রা এলাকার তাঁতি জাহিদুর রহমান বলেন, উপকরণের দাম দ্বিগুণ। সেই তুলনায় লুঙির দাম বেড়েছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা। একই এলাকার তাঁতি মো. আইয়ুব আলী জানান, করোনার আগে তিন হাজার টাকা কেজিতে সুতা কিনেছেন। এখন দাম প্রায় ছয় হাজার টাকা। প্রতি পাউন্ডে সুতার দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। পোষাতে না পেরে তাঁত বিক্রি করে এখন একটি এনজিওতে চাকরি করছেন এই তাঁতি।
কুমারখালী শেরকান্দি কাপুড়িয়াহাটের ব্যবসায়ী মো. তারেক বলেন, মঙ্গলবারের হাটে মান ও আকারভেদে একটি লুঙি বিক্রি হয়েছে ১৭৫ থেকে ২২৫ টাকায়, যা গত হাটের চেয়ে ১০-১৫ টাকা কম।
কাপুড়িয়াহাটের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, তিন বছরে লুঙি-গামছার দাম বেড়েছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা। এভাবে চলতে থাকলে তাঁতশিল্প হারিয়ে যাবে। তিনি সরকারিভাবে দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।
কুমারখালী তাঁত বোর্ডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মেহেদী হাসান জানান, তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ৩৪ কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদন শুরু হলে কাপড়ের মান বাড়ার পাশাপাশি দামও বাড়বে।
