ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গাছ কেটে সাবাড়, ধ্বংস বনায়ন

গাছ কেটে সাবাড়, ধ্বংস বনায়ন
×

কয়রার বানিয়াখালী খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকার চরে মাছ ধরার জন্য গাছ কেটে গর্ত করা হয়েছে -সমকাল

শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা)

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৩ | ১০:০৬

খুলনার কয়রায় সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর চরে বনায়ন অঞ্চলে যেখানে-সেখানে গর্ত খুঁড়ে মাছ শিকারের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। শিকারিরা তাদের সুবিধার্থে বনায়নের গাছ কেটে ফেলছেন। গর্তে পানি আটকে থাকায় সেখানে নতুন গাছও জন্মাতে পারছে না। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে চর বনায়ন। অথচ বহু বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে প্রাচীর হিসেবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করছে চর বনায়নের এসব গাছ।

দেখা গেছে, জোয়ারের সময় বনের মধ্যে মাছ শিকারের জন্য খুঁড়ে রাখা গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। ভাটার সময় জোয়ারের পানি নেমে গেলে গর্তের পানিতে আটকে পড়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। মাছ শিকারিরা ঘন ফাঁসের জাল দিয়ে এসব পোনা সংগ্রহ করেন। কয়েক মাস ধরে নদনদীর চরে জেলেরা এ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করছেন। এ কারণে অনেক স্থানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চরে গাছের পরিমাণ কমে আসছে।

সামাজিক বনায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ‘চর বনায়ন প্রকল্প’ শুরু হয়। প্রায় ৮২ হেক্টর জমিতে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর চর ও বেড়িবাঁধের পাশে ৩৪টি স্থানে বনায়ন করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনীর মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ, সরকারি জমি অবৈধ দখলদারমুক্ত রাখা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পশুপাখির আবাসস্থল গড়ে তোলা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলার গোবরা হরিহরপুর, কাঠকাটা, পাথরখালী, দক্ষিণ বেদকাশি, ঘড়িলাল, কয়রা সদরের ৪ নম্বর কয়রা, ৬ নম্বর কয়রাসহ কয়েকটি গ্রামে গত বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা গেছে, কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে গড়ে উঠেছে সবুজ বন। বনে আছে গোলপাতা, কেওড়া, গেওয়াসহ নানা প্রজাতির গাছ। চর বনায়নের এসব গাছ কেটে অনেক স্থানে মাছ ধরার জন্য গর্ত খুঁড়ে বিশেষ ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব এলাকার কয়েকটি স্থানে গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে মাছের ঘের। আবার কয়েক জায়গায় চর বনায়নের চারদিকে মাটির দেয়াল তুলে মাছ ধরার জন্য পানি আটকে রাখা হয়েছে।

উপজেলার বানিয়াখালী খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আবদুল গনী নামে এক ব্যক্তি নদীর চরে গড়ে ওঠা বনের মধ্যে মাছ ধরার গর্ত তৈরি করছেন। তিনি জানান, গ্রামের অনেকেই এভাবে চরের বনে গর্ত খুঁড়ে মাছ ধরার ফাঁদ বানায়। তাঁর তৈরি করা গর্তটি পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় তিনি আবার সেখানে গর্ত খুঁড়ছেন।

কয়রা সদরের মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে গড়ে ওঠা বনটি ধ্বংসের পথে। মাছ শিকারিদের দৌরাত্ম্যে নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না ওই বনে। পুরোনো গাছগুলোও ভাঙনে বিলীন হচ্ছে। অথচ এক সময় বিকেল হলেই পাখিদের কিচিরমিচির আর দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখর ছিল এখানের পরিবেশ।

কয়রার কাঠকাটা গ্রামের তাজমিনুর রহমান বলেন, চর বনায়নের জায়গায় চিংড়ি ঘের করতে প্রভাবশালী একটি চক্র তৎপর। কয়েক মাস আগে শাকবাড়িয়া নদীর চরের বন কেটে রাতারাতি গড়ে তোলা হয়েছে মাছের ঘের। সামাজিক বনায়ন অফিস থেকে মাঝেমধ্যে লোকজন এসে বনের তদারকি করে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

ঘড়িলাল গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, আগে চরে প্রচুর গাছ ছিল। এখন চর প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে। অনেক সময় মাছ ধরার জায়গা দখল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধের ঘটনাও ঘটে।

কয়রা উপজেলা সামাজিক বন অঞ্চলের কর্মকর্তা প্রেমানন্দ রায় বলেন, চর বনায়ন যাতে ধ্বংস করা না হয় সে জন্য এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে এ বন রক্ষায় সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে ক্ষতিটা সবারই হবে।

আরও পড়ুন

×