ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

দুই বছরে হালদায় ২২ ডলফিনসহ বিভিন্ন মাছের মৃত্যু

দুই বছরে হালদায় ২২ ডলফিনসহ বিভিন্ন মাছের মৃত্যু
×

বালুভর্তি নৌযান ধ্বংস করেন রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোনায়েদ কবির। ছবি: সমকাল

শফিউল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ২২:৩৯ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

প্রাকৃতিক মৎস প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে বালু উত্তোলন, চর থেকে মাটি কাটা, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, অবৈধভাবে মাছ শিকার করায় মা মছের প্রজননসহ হালদার জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে। এতে গত দুই বছরে হালদা নদীতে ২২টি ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মৃত্যু হয়েছে।

সম্প্রতি হালদা নদীর রাউজানের ছায়ার চর থেকে একটি ডলফিন মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ডলফিনটিকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে একটি ১১ কেজি ওজনের আহত কাতলা মাছ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা কাতলা মাছটি কোন যান্ত্রিক নৌযানের আঘাতে আহত হয়। আহত কাতলা মাছটির পেটে প্রচুর পরিমাণ ডিম ছিল। মাছটি উদ্ধার করার পর বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করলেও বাচাঁনো সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকৃতিক মৎস প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীর মোহনায় রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কচুখাইন, মোকামী পাড়া, নগরীর মোহরা, সার্কদা এলাকায় ড্রেজার ও পাওয়ার পাম্প দিয়ে অবৈধবাবে বালু উত্তোলন করছে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। নদীর রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ছায়ার চর, হালদার চর এলাকায় ড্রেজার দিয়ে চরের মাটি কেটে চর থেকে কাটা মাটি যান্ত্রিক নৌযানে করে পরিবহন করা হচ্ছে হালদা নদী দিয়েই। নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে উত্তোলন করা বালুও প্রতিদিন যান্ত্রিক নৌযানে করে হালদা নদী দিয়ে রাউজান ও হাটহাজারীসহ নগরীর মোহরায় নিয়ে গিয়ে যান্ত্রিক নৌযান থেকে বালু তুলে স্তুপ করে প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীরা তা বিক্রয় করছে। এ ছাড়া নদীর বিভিন্ন এলাকায় ঘের জাল বসিয়ে ও বড়শি দিয়ে নিয়মিত মাছ শিকার চলছে।

নদীর তীরে বসবাসকারী বাসিন্দারা জানান, রাতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ড্রেজার দিয়ে হালদা নধী থেকে বালু উত্তোলন ও চর থেকে মাটি কেটে যান্ত্রিক নৌযানে করে বালু ও মাটি হালদা নদী দিয়ে পরিবহন করছে। রাউজান, হাটহাজারী, নগরীর মোহনা এলাকায় প্রতিনিয়ত জাল বাসিয়ে ও বড়শি দিয়ে মা মাছ শিকার করছে অনেক। সম্প্রতি হালদা নদী থেকে উদ্বার মৃত ডলফিনটি মাছ ধরার জালে আটক হওয়ার পর ডলফিনটিকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

এদিকে হালদা নদীতে মা মাছের প্রজনন বৃদ্ধির জন্য নদীর সব বালু মহল ইজারা বন্দ করে দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। নদীর বালু মহল ইজারা দেওয়া বন্ধ করা হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদী থেকে প্রতিনিয়ত ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। হালদা নদীতে মা মাছের প্রজনন রক্ষায়  নদীর নাজির হাট থেকে হালদা নদীর মোহনা কালুরঘাট পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতে সারা বছর মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। তবুও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে চলছে মাছ শিকার। নদীতে বালু খেকোদের অত্যাচার, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, মাছ শিকারের ফলে গত দু বছরে হালদা নদীতে ২২টি ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ মারা যায়। এতে হালদার জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে।

হালদা নদীতে অভিযান চালিয়ে রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোনায়েদ কবির সোহাগ, হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুহুল আমিন গত দুই বছরে বিপুল পরিমাণ জাল উদ্ধার করেন। নদীতে বালু উত্তোলনকারী ড্রেজার ও পাওয়ার পাম্পও ধংস করা হয়। অখচ এত অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, ড্রেজার ও পাওয়ার পাম্প দিয়ে বালু উত্তোলন, মাছ শিকার। বর্তমানে নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার ভারা মৌসুম চললেও হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছাড়েনি।

অপরদিকে হালদা নদীতে ডলফিন হত্যা ও মা মাছ হত্যার ব্যাপারে গত ১১ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি আবদুল কাইয়ুম লিটন ভার্চুয়াল কোর্ট ও উচ্চ আদালতে রিট করেন। গত ১২ মে মঙ্গলবার রিটের শুনানী শেষে ভার্চুয়াল হাইকোর্টের বিচারপতি ওবাইদুল হাসান হালদা নদীতে ডলফিন রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা ৭২ ঘন্টার মধ্যেই মেইলযোগে আদালতকে জাাননোনের নির্দেশ প্রদান করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকতাদের।

এরপর গত ১২ মে মঙ্গলবার দুপুরে রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোনয়েদ কবির সোহাগ রাউজান উপজেলা মৎস সম্প্রসারণ অদিদপ্তরের কর্মকর্তা ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে হালদা নদীর রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের কাগতিয়া আজিমের ঘাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান চলাকালে সাড়ে তিনশ' মিটার জাল উদ্ধার করা হয় হালদা নদী থেকে। এ সময় হাটহাজারীর আমতোয়া এলাকায় ৩ হাজার ঘনফুট বালু ভর্তি যান্ত্রিক নৌযান আটক করা হয়। পরে আটক করা বালু ভর্তি যান্ত্রিক নৌযান ধংস করে হালদা নদীতে ডুবিয়ে দেয় রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোনায়েদ কবির সোহাগ।

রাউজান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোনায়েদ কবির সোহাগ বলেন, ‌‘হালদা নদীতে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ জাল উদ্বার করে তা ধংস করা হয়। বালু উত্তোলনকালে অভিযান চালিয়ে ভালু ভর্তি যান্ত্রিক নৌযান ও বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম ধংস করা হয়। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কারীদের অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়। এ ছাড়া হালদা নদীর মা মাছ ও ডলফিন হত্যার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নদীর ডলফিন ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় অভিযান চলবে প্রতিনিয়ত।’

আরও পড়ুন

×