ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর

তাদের চোখ এখনও ভেজা

তাদের চোখ এখনও ভেজা
×

বাবার কবরের সামনে দোয়া করছে শহীদ ইয়াহিয়ার ছেলে সালমান সমকাল

আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | ০০:০৭

জুলাই অভ্যুত্থানে সারাদেশের মতো সিরাজগঞ্জেও ঝরে গেছে বহু তরুণ-তাজা প্রাণ। আন্দোলনে শহীদদের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা-বাবা ও স্বজনরা। অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের চোখ এখনও ভিজে আছে অশ্রুতে। তাদের চাওয়া, আর যেন কোনো স্বৈরাচার ফিরে না আসে। খুনিদের যেন দ্রুত বিচার হয়।
সিরাজগঞ্জে গ্যাজেটভুক্ত চব্বিশের শহীদ 
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি গ্যাজেট অনুযায়ী সিরাজগঞ্জে ১৩ জন ছাত্র-শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫২৪ জন। সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন নুরুল আমীন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাতজন শহীদ হন গত বছরের ৪ ও ৫ আগস্ট নিজ জেলায়। বাকি ছয়জন ঢাকা ও গাজীপুরে। জেলা সদরের এস এস রোডে গত বছরের ৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের মারপিটে ও গুলির আঘাতে শহীদ হন যুবদল নেতা ডা. মো. সোহানুজ্জামান রঞ্জু, চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ ও ছাত্র সুমন শেখ। একই দিন এনায়েতপুর থানার সামনে শহীদ হন কলেজছাত্র শিহাব আহম্মেদ, হাফেজ সিয়াম হোসেন ও তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের কড্ডার মোড়ে শহীদ হন ভ্যানচালক শিহাব উদ্দিন প্রামাণিক।
৫ আগস্ট এস এস রোডে শহীদ হন শাহজাদপুর রূপপুরের ছাত্র সুজন মাহমুদ। গাজীপুরে শহীদ হন ছাত্র অন্তর ইসলাম, চৌরাস্থা মোড়ে সেনেটারি মিস্ত্রি জাহাঙ্গীর আলম ও আশুলিয়ায় রিকশচালক মো. লেবু। এর আগে ২০ জুলাই চৌরাস্থামোড়ে শহীদ হন গার্মেন্টস কর্মী নজরুল ইসলাম। গত বছরের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় শহীদ হন অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্মচারী মো. মনিরুজ্জামান।
স্বজনের আক্ষেপ
এনায়েতপুর থানা প্রাঙ্গণে গত বছরের ৪ আগস্ট শহীদ হন তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী। তাঁর বাড়ি শাহজাদপুরের খুকনীর ঝাউপাড়ায়। তাঁর স্ত্রী শাহানা খাতুন সমকালকে বলেন, ‘আজ আমি স্বামী হারা। দুই ছেলেমেয়েও তাদের বাবাকে হারিয়েছে। আমার স্বামীর মতো শহীদ যোদ্ধাদের রক্তে গণঅভ্যুত্থান হলো। ফ্যাসিস্ট সরকারেরও পতন হলো। কিন্তু যারা ক্ষমতায় গেলেন তারা শহীদদের খুনের বিচারও করতে পারছেন না। খুনি শেখ হাসিনারও কিছুই হলো না। চাঁদাবাজে ভরে গেছে এ দেশ। কি এমন দেশ চেয়েছিলাম?
এনায়েতপুরে একই ঘটনায় শহীদ হন কলেজছাত্র শিহাব হোসেন ও হাফেজ সিয়াম হোসেন। তাদের হত্যা মামলার বাদী সলেয়মান হোসেন ও হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আসামি শিবপুরের হাফিজ মাস্টার আবু হানিফ ভূঁইয়াসহ ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ ধরছে না। প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গে তাদের সখ্যতা আমাদের ভীত করছে।
মামলার তদন্তে ধীরগতি
সিরাজগঞ্জের সাত শহীদের স্বজনের পক্ষ থেকে আটটি মামলা হয়েছে। সাবেক এমপি অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত, তানভীর শাকিল জয়, সাবেক পানি সচিব কবির-বিন আনোয়ারসহ ৬৭২ জনের নামে এবং দুই হাজার ৭৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। সাবেক এমপি জান্নাত-আরা-তালুকদার হেনরী, তানভীর ইমাম, চয়ন ইসলাম, গাজী সফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. আব্দুল আজিজ, আব্দুল মমিন মণ্ডল, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামিম তালুকদার লাবুসহ ১৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এনায়েতপুরে ১৫ পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমদ মোস্তফা খান বাবু, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, খুকনী ইউপি চেয়ারম্যান মুল্লুক চাঁন ও ভাঙ্গাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম ছাড়াও অজ্ঞাত আরও ৬ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার উৎখাত আন্দোলনের বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের মূল বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত চলছে ধীরগতিতে। মূল আসামিরাও অধরা। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক আসামি বিভিন্ন দলের ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। প্রকাশ্যে ঘুরলেও তাদের গ্রেপ্তারে অনিহা দেখা গেছে পুলিশের মধ্যে।
রিমান্ডে ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ 
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম দিনে গত বছরের ৪ আগস্ট জেলা শহরের এস এস রোডে যুবদল নেতা ডেন্টিস্ট মো. সোহানুজ্জামান রঞ্জু, চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ ও ছাত্র সুমন শেখ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক এমপি ড. জান্নাত-আরা-তালুকদার হেনরী ও তাঁর স্বামী সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামিম তালুকদার লাবুসহ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা হয়। এ ছাড়া লাইসেন্স করা তিনটি শর্টগান ও গোলাবারুদ নির্ধারিত সময়ে জমা না দেওয়ায় হেনরী-লাবুর বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা হয়। মামলার আসামি হেনরী ও লাবুকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমান জিয়া গত মে মাসে তদন্ত করেন। রিমান্ডের সময় দায়িত্বে থাকা ৩১ জন পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্যও গ্রহণ করেন তিনি। সদর থানার সাবেক ওসি হুমায়ুন কবীর, পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মজিদ, উপপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক ও শাহিন মিয়াসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওই সময় আরও কয়েকটি তদন্ত হয়। কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। তাদের বদলি করেই দায় সেরেছে কর্তৃপক্ষ।  
জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য
পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে সাবেক এমপি হেনরী ও তাঁর স্বামীকে রিমান্ডে নিয়ে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে ঊর্ধ্বতন বরাবর পাঠনো হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর তদন্ত এখনও চলছে। শেষ হলেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। 
এনায়েতপুর থানার ওসি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাগুলোর ফরেনসিক আলামত রয়েছে। পুলিশি কার্যক্রম এতদিন স্থবির হয়ে পড়ায় তদন্তে গতি বাড়েনি। আসামিরাও গা-ঢাকা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×