শয্যাশায়ী স্ত্রী, বৃদ্ধের কাণ্ড ও কয়েকটি জিজ্ঞাসা
স্ত্রীকে মাটি খুঁড়ে জ্যান্ত কবর দিতে উদ্যত হয়েছেন খলিলুর রহমান- সমকাল
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১১:০১ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১১:০৫
পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে খোশেদা বেগম শয্যাশায়ী প্রায় ছয় বছর ধরে। নাওয়া-খাওয়া সবই তাঁকে সারতে হয় বিছানায়। বৃদ্ধ স্বামী খলিলুর রহমান (৭৫) একাই দেখভাল করেন তাঁর। শুক্রবার দুপুরের পর বিছানায় মলত্যাগ করেন খোশেদা (৭০)। এতে মেজাজ হারান খলিল। স্ত্রীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসেন বাড়ির উঠানে। সেখানেই কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে জ্যান্ত কবর দেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে রক্ষা পান খোশেদা।
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার এই ঘটনা মোবাইল ফোনে ধারণ করেছিলেন খলিলুরের নাতি মো. খোকন (১৯)। সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রাতারাতি তা ভাইরাল হয়। খবর পেয়ে গতকাল শনিবার শ্রীবরদী থানার ওসি ও কাকিলাকুড়া ইউপি চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে যান। তখন পালিয়ে যান খলিলুর রহমান।
কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের খোশালপুরের মৃত জহুর আলীর ছেলে খলিলুর রহমান। তাঁর একমাত্র ছেলে থাকেন বিদেশে। পুত্রবধূ থাকেন আলাদা। খলিলুরের একমাত্র মেয়েটিও স্বামীর সঙ্গে থাকেন সৌদি আরব। তাদের ছেলে মো. খোকন শুক্রবারের ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। তাঁর দাবি, নানিকে মারধরের ঘটনা দেখতে পেয়ে সৌদি আরবপ্রবাসী মা-বাবার কাছে পাঠানোর জন্য ভিডিও করেছিলেন। এক বন্ধু সেটা ফেসবুকে ছেড়ে দিলে তা ভাইরাল হয়। খোকনের ভাষ্য, নানিকে দীর্ঘদিন ধরে দেখাশোনা করতে গিয়ে মানসিক চাপে নানার (খলিল) মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ জন্যই এমন কাণ্ড ঘটাতে পারেন।
প্রতিবেশী সুজন মিয়া বলেন, চিৎকার শুনে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খলিলুর রহমানের বাড়িতে যান। তাঁর ভাষ্য, ছয় বছর ধরে খোশেদা বেগম পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিনি চোখেও দেখতে পান না। এমন রোগী টানতে টানতে ওই বৃদ্ধ (খলিল) হয়তো অধৈর্য হয়ে পড়েন। শুক্রবার খোশেদা বিছানায় মলত্যাগ করলে রেগে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন খলিল।
অন্য প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, খলিলুর রহমান ভালো মানুষ। কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই মনমরা থাকতেন। শুক্রবারও তিনি স্ত্রী খোশেদার জন্য হাইকমোড কিনে আনেন। দুপুরে স্ত্রী বিছানায় মলত্যাগ করলে খেপে যান খলিল। স্ত্রীকে টেনে উঠানে এনে কোদাল দিয়ে কবর খুঁড়তে থাকেন। এতে বাধা দিলে খোশেদাকে চড়থাপ্পড়ও মারেন। পরে কয়েকজন এগিয়ে গেলে সেখান থেকে চলে যান খলিল।
কাকিলাকুড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. হামিদুল্লাহ বলেন, এদের সংসারে কোনো অভাব নেই। বৃদ্ধাকে স্বামী ছাড়া কেউ দেখেন না। ঘটনার সময়ও নাতি খোকন নানির পাশে না দাঁড়িয়ে ভিডিও করে। আসলে ওই লোক (খলিল) রেগে গিয়ে উঠানে গর্ত করেছিলেন স্ত্রীকে ভয় দেখাতে। তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেন না তিনি।
ভাঙা ঘর থেকে উদ্ধার বৃদ্ধা
একই দিন উপজেলার কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চিথলিয়া গ্রাম থেকে জেলেহা বেগম (৮০) নামে এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করেছে আজকের তারুণ্য নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনের আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম রতনের ভাষ্য, জেলেহা বেগমের স্বামী আলফাজ উদ্দিন মারা গেছেন। দুই ছেলে মো. জুলহাস ও মো. জুলহককে নিজের জমিও লিখে দিয়েছেন ওই বৃদ্ধা। তারা পরিবার নিয়ে পাকা ঘরে থাকেন। অথচ বৃদ্ধা মাকে রেখেছেন ভাঙাচোরা একটি ঘরে। ছেলেরা তাঁর ভরণপোষণও করেন না। প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতে গেলে উল্টো তাদের গালাগালি করে ছেলেরা। সংবাদ পেয়ে তারা জেলেহা বেগমকে উদ্ধার করেন। পরে ছেলেরা মায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। ভবিষ্যতে তারা মায়ের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেই সন্তান দিয়ে কী হবে?
শ্রীবরদী থানার ওসি মো. আনোয়ার জাহিদ বলেন, জীবনসায়াহ্নে এসে দুই বৃদ্ধার মর্মান্তিক পরিণতি বিশ্বাস হয় না। কিন্তু এটাই তাদের জীবনের গল্প। যে সন্তান মাকে দেখেন না, সেই সন্তান দিয়ে কী হবে? ভুক্তভোগীদের পক্ষে কেউ আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলে সহায়তা করবে পুলিশ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদের ভাষ্য, ‘আগে শুনতাম বৃদ্ধ বয়সে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের লাঠি। গতকালের (শুক্রবার) ঘটনা দেখে মনে হয়, বৃদ্ধ বয়সে নারীরা অসুস্থ হলে স্বামীও তাদের পর হয়ে যান। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’ দুটি ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে ইউএনও দায়িত্ব দিয়েছেন পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের। দুজনের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন এগিয়ে আসবে বলেও জানান তিনি।
- বিষয় :
- কবর
- বৃদ্ধা
- বৃদ্ধাকে নির্যাতন
