প্রকল্প নিয়ে ফ্যাসাদে এলজিইডি
এলজিইডি
মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫
পিরোজপুর-২ আসনের এমপি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার জোরে পাশের জেলা পটুয়াখালীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ২২টি উন্নয়ন প্রকল্পের ৭৬ কোটি টাকার কাজ বাগিয়েছিলেন তিনি। গত বছর ৫ আগস্টের পর ঠিকাদার মহারাজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের কাজ নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছে এলজিইডি।
এসব উন্নয়ন প্রকল্পের কোনোটির কাজ মাঝপথে এসে থেমে গেছে। আবার কোনোটি একেবারে শুরুর পর্যায়ে। গত এক বছর প্রকল্পের কাজে গতি না থাকায় এবড়োখেবড়ো সড়ক দিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। এতে নিত্য ভোগান্তিতে পড়ছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে মহারাজ পরিবারের ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালী এলজিইডিতে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে; যা এলজিইডিতে ‘মিরাজ-মহারাজ সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত ছিল।
পটুয়াখালীর এলজিইডি সূত্র জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে পরের তিন অর্থবছরে এডিপিভুক্ত প্রকল্পের আওতায় মহারাজের ইফতি ইটিসিএল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ২২টি প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পটুয়াখালীর গলাচিপায় তিনটি, মির্জাগঞ্জে তিনটি, কলাপাড়ায় দুটি, দুমকিতে একটি, রাঙ্গাবালীতে একটি এবং সদর উপজেলায় ১২টি প্রকল্প রয়েছে। সব মিলিয়ে ২২ প্রকল্পের প্রক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। দুটি প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর কাজ ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এগিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি গড়ে ৪০ শতাংশ। তবে প্রকল্পের অগ্রগতির চেয়ে টাকা উত্তোলন হয়েছে বেশি।
সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের ছোট ভাই মিরাজুল ইসলাম ছিলেন ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। শুধু পটুয়াখালী নয়, আশপাশের জেলায় এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ না করেই কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তবে মহারাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইফতি ইটিসিএলের পটুয়াখালীর কাজগুলো স্থানীয় ঠিকাদাররাই বাস্তবায়ন করত। তবে ৫ আগস্টের পর ইফতি ইটিসিএলের মালিকরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং তাদের ব্যাংক হিসাব সরকার ফ্রিজ করে। এতে স্থানীয় সাব-ঠিকাদাররা বিপাকে পড়েন। সাব-ঠিকাদারের অনেকে আবার আওয়ামী লীগ সমর্থক হওয়ায় তাদের কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। এতে এসব উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিপদে পড়েছে এলজিইডি।
সরেজমিন দেখা যায়, কুয়াকাটা-ঢাকা মহাসড়কের সদর উপজেলার করমজাতলা থেকে পটুয়াখালী-বাউফল-দশমিনা আঞ্চলিক মহাসড়কের লোহালিয়া সেতুর সংযোগ সড়ক, পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বহালগাছিয়া এলাকায় পিচঢালা রাস্তা, ড্রেনেজ; গলাচিপার ছোনখোলা, লামনা, খারিজ্জমা, কচুয়া, কালারাজা, উত্তর চরবিশ্বাস, চরআগস্তি; কলাপাড়ার বড় বালিয়াতলী, মিঠাগঞ্জ, ছোট বালিয়াতলী, ধুলাসর, বানাতি বাজার; মির্জাগঞ্জের চরখালী, কাঁকড়াবুনিয়া, মজিদবাড়িয়া, দক্ষিণ মজিদবাড়িয়া, রামপুরা, কেওয়াবুনিয়া; রাঙ্গাবালীর আমলীবাড়িয়া, দক্ষিণ কাজির হাওলা, কাছিয়াবুনিয়া বাজার; দুমকী এবং সদর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও আয়রন ব্রিজের সব কাজই বেহাল।
সদর উপজেলার পশুরবুনিয়ার রহিম বিশ্বাস বলেন, ‘এ রাস্তা লইয়্যা মোরা খুব কষ্টে আছি। রাস্তা দিয়া এহন রিকশা-গাড়ি চলে না। মোরা নিজেরা মাটি দেই আবার চলি, মাটি দেই আবার চলি। এক বছর ধইর্যা ঠিকাদার দেহিই না এইহানে।’
স্থানীয় কর্মজীবী সোহেল রানা বলেন, ‘এ সড়কটি অর্ধেক কাজ করে এক বছর ফেলে রাখা হয়েছে। শুধু খোয়া বিছিয়ে রেখে ঠিকাদার উধাও। কাজ হবে কী, হবে না তাও কিছু বুঝতে পারছি না। এখন তীব্র ভোগান্তি হচ্ছে।’
পশুরবুনিয়ার গৃহিণী হালিমা বেগম বলেন, ‘আমাগো কষ্ট হইতাছে। খোয়া পায়ে ঢুইকা জুতা নষ্ট হইয়্যা যায়। মাসে জুতা লাগে তিন জোড়া। আমরা গরিব মানুষ জুতা পা দিয়া হাঁটতে পারি না।’
পশ্চিম কালিকাপুরের ভ্যানচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার তো পালাইছে আর রাস্তা ভাইঙ্গা-চুইরাই রইছে। এই রাস্তা দিয়া গাড়ি চালাইলে গাড়ি ভাইঙ্গা-চুইরা যায়। অ্যাহোন যদি নতুন কইর্যা কাজ করে তাইলে জনগণের সুবিধা হইবো।’
টাউন বহালগাছিয়ার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ঠিকাদার কাজ করতেছে না। ঠিকাদার হয়তো টাকা খাইয়্যা পলাইয়্যা গ্যাছে। এই রাস্তা দিয়া কোনো গাড়ি-অ্যাম্বুলেন্স চলতে পারে না। রোগী লইয়্যা যাইতে কষ্ট হয়।’
ইফতি ইটিসিএল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজুল ইসলাম ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের বক্তব্য নিতে পারেনি সমকাল। তবে, প্রকল্পের বিষয়ে কথা হয়েছে মহিউদ্দিন মহারাজের শ্বশুর ও তুষখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শরীফ মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ওরা তো দেশের বাইরে। আমি জানি না এখন কীভাবে কাজ করবে। তাছাড়া পটুয়াখালীতে তাদের কাজ আছে এটাই আমাকে কখনও বলেনি। তারপরও মহারাজের সঙ্গে কথা হলে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলব।’
পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর জানান, পটুয়াখালীতে মহারাজের প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাজ রয়েছে। এখন পর্যন্ত গড়ে ৪০ শতাংশ কাজ হয়েছে। ঠিকাদারের দেশত্যাগ এবং তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় সবকিছু থমকে আছে। এ অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থানীয় ঠিকাদাররাও কাজে আগ্রহী নয়। এ কারণে ২২ প্রকল্পের কাজ স্থবির হয়ে আছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- এলজিইডি
