যে রোগে স্বামী-বড় ছেলের মৃত্যু, সেই রোগ ছোট ছেলেরও
ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজের ভাঙা বাড়ির সামনে আড়তি -সমকাল
শাহারুল আলম, জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২০ | ০৫:৫৪ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২০ | ০৬:০৪
সারা বছর ধরে ওদের সংসারে অভাব লেগেই থাকতো। কিন্তু তারপরও মা-বাবা ও দুই ভাইয়ের সংসারে সুখের কোনো কমতি ছিল না। ওদের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট হিন্দুপাড়ায়। বাবা মতিলাল রবিদাস আর মা আরতি রানী রবিদাস। কিন্তু অজানা এক রোগে সুখের সেই সংসার তছনছ হয়ে গেছে।
সুখের এই সংসারে প্রথমে রোগ বাসা বাঁধে মতিলাল রবিদাসের শরিরে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মতিলাল রবিদাস শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ধীরে ধীরে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যান। বন্ধ হয়ে যায় চলাচল। এক সময় চিকিৎসার অভাবে মারা যান আরতির স্বামী মতিলাল রবিদাস।
স্বামীর মৃত্যুতে দুই ছেলেকে নিয়ে দুখের মহাসাগরে পড়ে যান আরতি। এরপর বিপদ কেটে উঠতে না উঠতেই আরতি রানীর সংসারে প্রবেশ করে সেই রোগ। স্বামীর মতই অজানা রোগের শিকার হয় বড় ছেলে সজল রবিদাস। তার বয়স ছিল ১৬ বছর। সেও মারা যায় চিকিৎসার অভাবে। একই সমস্যা দেখা দিয়েছে তার ছোট ছেলে সহোদেব রবিদাসের শরীরেও। গত সাত মাস ধরে আরতি রানী ছেলের নিথর দেহ নিয়ে পড়ে আছেন বাড়িতে। অভাবের কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে স্বামী ও বড় সন্তান। এবারও সেই নিয়তিই দেখছেন তিনি। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না ছেলের। চোখের সামনে তিলে তিলে ছোট সন্তানও মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। একইসঙ্গে অসহায় আরতির সংসারেও অভাব অনটনে দিনদিন নেমে এসেছে অন্ধকার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কালাই উপজেলার পুনট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই কয়েকটি ঝুপড়ি ঘর। সেখানে রবিদাস সম্প্রদায়ের বসত। তারই মধ্যে হাফ শতক জায়গায় ভাঙা দু’টি ঝুপড়ি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিধবা আরতি রানী তার রোগাক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে জীবন-যাপন করছেন।
কথা হয় আরতি রানী রবিদাসের সাথে। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এক সময় স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার খুব ভালোভাবেই চলছিল। জুতা সেলাই করেই সংসার চলত। তখন অন্তত দু’বেলা পেটে ভাত জুটতো। বর্তমানে তাও জুটছে না। অজানা এক জটিল রোগ কেড়ে নিয়েছে স্বামী ও বড় সন্তানকে। একই রোগ ভর করেছে ছোট ছেলেও ওপরও। এমন রোগ ডাক্টারও নির্ণয় করতে পারে না।
তিনি বলেন, ওদের শরীরে অসম্ভব ঝাঁকুনি আর কাঁপুনি আসে। চলাফেরার সময় শরীর কাঁপতো। হাত-পা সবসময় অবশ হয়ে থাকত। ঠিকমত চলাচল করতে না পেরে প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে থাকত ওরা। মুখ বাঁকা হত এবং কথা বলতো অস্পষ্ট। কোন কিছু ঠিকমতো খেতেও পারতো না। স্বাস্থ্য ধীরে ভেঙে যেত। অন্যের সাহায্য ছাড়া খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা ও প্রসাব-পায়খানা কিছুই করতে পারত না।
আরতি রানী আরও বলেন, স্বামী-বড় ছেলে অসুস্থ হওয়ার পর অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করি। কোনভাবে পেটের ভাত যোগান হত। ওই অবস্থায় টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় স্বামী ও সন্তান। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার দেনা করে ওদের কিছুদিন চিকিৎসা করেছিলাম। কিন্তু ওরা আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাবে তা কখনও ভাবিনি। ওরা মারা গেছে বটে আমাকেও মেরে গেছে। আজ পর্যন্ত ধার-দেনার টাকাই পরিশোধ করতে পারিনি। তার ওপর আরেক ছেলে অসুস্থ। এখন আমি কি করবো বুঝে ওঠে পারছি না। বাবা-বড় ভাইয়ের রোগের লক্ষণই দেখা দিয়েছে ছোট ছেলে সহোদেব রবিদাসের শরীরে। হাফ শতক জমির ওপরে ভাঙা বাড়ি ছাড়া আমার কোন সম্পদ নেই। কোন সাহায্য-সহযোগিতাও পাচ্ছি না। একদিকে সংসারের দায় অন্যদিকে ছেলে অসুস্থ। অনেক বিপদে আছি। চিকিৎসা তো দূরের কথা, অসুস্থ ছেলের মুখে ভাত যোগান দেওয়ায় মুশকিল হয়ে গেছে।
এসব কথা বলতে গিয়ে আরতি রানী হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলেন।
অসুস্থ সহোদেব রবিদাস বলে, আমি বাঁচতে চাই। আমাকে দয়া করুন। ভালো হয়ে লেখা-পড়া করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবো আমি। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমার কোন পথ নেই। আমার চিকিৎসার একটু ব্যবস্থা করুন। আজ আমার শখ অন্যদের মত লেখাপড়া করে মায়ের সেবা করার।
প্রতিবেশী স্বাধীন রবিদাস বলেন, এক সময় ভালভাবেই চলছিল তাদের সংসার। অজানা রোগে অসুস্থ হয়ে স্বামী ও বড় সন্তান মারা যায়। একই উপসর্গ দেখা দিয়েছে আবার ছোট ছেলের। আসলে ওই বিধবা অনেক কষ্ট পাচ্ছেন ছেলেকে নিয়ে। সকলের সহযোগিতা করা উচিত।
কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, ঘটনাটা শুনেছি। ছেলেটির চিকিৎসার ব্যপারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।
- বিষয় :
- সাহায্যের আবেদন
- রাজশাহী
- জয়পুরহাট
- কালাই