ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘কাঁচা’ টাকার নেশা, গারো পাহাড়ে থামছে না চোরাকারবারি

‘কাঁচা’ টাকার নেশা, গারো পাহাড়ে থামছে না চোরাকারবারি
×

ছবি: ফাইল

দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:৩১ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:০৪

গারো পাহাড় দিয়ে চোরাই পণ্য পাচার থামছেই না। প্রায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চোরাই পণ্য ধরা পড়ছে। এসবের সঙ্গে জড়িত কিছু চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বিগত ৯ মাসে বিজিবির তৎপরতা অতীতের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। এ সময়ে তারা প্রায় শত কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে। গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েক ডজন চুনোপুঁটি। কিন্তু তাতেও থামছে না সীমান্তের চোরাকারবারি।

এদিকে বিভিন্ন ধরনের মাদক পরিবহন করতে গিয়ে সীমান্তের অনেক বেকার তরুণ অবৈধ ব্যবসায় জড়িত হওয়ার পাশাপাশি আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদকে। গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। তাদের ভয়ে তটস্থ থাকেন সীমান্ত এলাকার মানুষসহ সংবাদকর্মীরা। চোরাকারবারি নিয়ে সংবাদ করায় গত কয়েক মাসে হামলার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। তাদের মধ্যে ঝিনাইগাতী উপজেলার সাংবাদিক খোরশেদ আলমকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি।

জানা গেছে, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ি এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে গারো পাহাড়। পুরো এলাকাটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খুব কাছে। শ্রীবরদীর রাঙ্গাজান, হারিয়াকোনা, বাবেলাকোনা, ঝিনাইগাতীর ছোট গজনী, বড় গজনী, রাংটিয়া ও নালিতাবাড়ি উপজেলার নাকুগাঁও, পানিহাতা, দাউধারা, ডালুকোনা, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, পোড়াবাড়ি, সমস্‌চুড়া নামে গ্রামগুলো ভারতের তুরা ও আমবাতি জেলা লাগোয়া। এসব এলাকায় ভারতীয় চোরাই পণ্য আনা-নেওয়া সহজ। ২০০১ সালের আগে সীমান্তের ওপার থেকে আসা ছোটখাটো চালান ধরা পড়ত। এর মধ্যে বেশির ভাগ ছিল ভারতীয় মদ ও গরু। কিন্তু গত এক বছরে  উল্লিখিত উপজেলার সীমান্ত দিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ পণ্য।

বিজিবির তথ্যমতে, অবৈধ পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ, কম্বল, শাড়ি, থ্রি-পিস, চিনি, গরুর মাংস, জিরা, এলাচ, মোবাইল সরঞ্জাম। সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর সীমান্তে বিশেষ অভিযান চালায় বিজিবি। এ সময় ঝিনাইগাতীর ফাকরাবাদ ও হালুয়াঘাটের নামছাপাড়া ও ডুমনিকুড়া সীমান্ত থেকে জব্দ করা হয় ৩৮৮ বোতল মদ, ওরিও বিস্কুট দুই হাজার ১৬০ প্যাকেট, ফুঁচকা ৮০ প্যাকেট, নেভিয়া সফট ক্রিম দুই হাজার ৮৩০টি এবং এক লাখ ৩০ হাজার জিলেট ব্লেডসহ একটি পিকআপ। জব্দ মালপত্রের মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

বিজিবি জানায়, চলতি ২০২৫ সালের ৯ মাসে কমপক্ষে আশি কোটি টাকার অবৈধ ভারতীয় পণ্য জব্দ করেছেন তারা। স্থানীয়দের ধারণা, বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়েও অনেক পণ্য পাচার হয়েছে।

সীমান্ত এলাকাবাসী জানান, ২০-২৫ বছর আগে শ্রীবরদী সীমান্ত এলাকা দিয়ে শুধু গরু ও মদ আনত চোরাকারবারিরা। সেই সংখ্যাও খুব একটা বেশি ছিল না। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে চোরাচালান বৃদ্ধি পায়। এতে সহয়তা করে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। ওই সময় থেকে সীমান্তের লোকজন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধ পথে ব্যবসা শুরু করেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার সংবাদকর্মী দুদু মল্লিক, শ্রীবরদীর আবদুল্লাহ রানা ও নালিতাবাড়ির এম সুরুজ্জামানের ভাষ্য, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত উলফা সদস্যরা সীমান্ত এলাকার কতিপয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকজনকে অবৈধপথে পণ্য আনার জন্য উৎসাহিত করে। দরিদ্র মানুষ ওই প্রস্তাব লুফে নেন। যে কারণে চোরাচালান বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার পাহাড়ি নদীগুলোতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর সীমান্তের মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যে কারণে মানুষ চোরাচালানের পথ ত্যাগ করে।

২০২৪ সালে সরকার পতনের পর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নদী দখল করে যত্রতত্র বালু তোলা এবং গারো পাহাড়ের পাথর ও সাদামাটি তোলা শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে বাধ্য হয়ে প্রশাসন পরিবেশ রক্ষায় বালুর ইজারা বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকে গত এক বছরে ফের চোরাচালানের ঘটনা বেড়েছে। আড়ালে থেকে বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা স্থানীয় তরুণ ও অসচ্ছল মানুষকে চোরাই পথে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজে যুক্ত করে। তারা রাতে সীমান্তের গহিন জঙ্গল ও নদীপথে নিয়ে আসে ভারতীয় পণ্য। এসব পণ্যের কিছু অংশ বিজিবির হাতে ধরা পড়লে আটক হয় চুনোপুঁটিরা। আড়ালেই থেকে যায় রাঘব বোয়ালরা।

সংবাদকর্মী এম সুরুজ্জামান বলেন, ‘আন্ডার গ্রাউন্ডে বিত্তশালীরা এই ব্যবসায় টাকার যোগান দেন। এক চালান ধরা খেলেও অন্য চালানে তারা দ্বিগুণ-তিনগুণ লাভ করেন। তাই তাদের কোনো লোকসান নেই।’ তিনি বলেন, ভারতের দেওয়া কাঁটাতারের ভেতরে পানি যাওয়ার জন্য চুঙ্গি বা কালভার্ট বসানো হয়েছে। যুবকরা চুঙ্গির ঢাকনা খুলে সেখান দিয়ে মাদক নিয়ে আসে।

শ্রীবরদীর সিংগাবরুনা ইউনিয়নের আদিবাসী যুবক রাসেল সাংমা জানান, চোরাচালানের টাকা যোগান দেন ঢাকা থেকে আসা বড় ব্যবসায়ীরা। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফকরুজ্জামান কালুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোটি কোটি টাকার মালপত্র আটকের পরও কেন চোরাচালান কমছে না। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এসব উত্তর দেওয়া কঠিন। এমনিতেই মিথ্যা মামলায় কয়েক মাস জেল খেটে এসেছি। সত্য কথা বলতে চাই না। কারণ বিপদ বাড়বে। আরও মামলা খাবো।’

৩৯ বিজিবি ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদি হাসান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন কাঁচা টাকা লেনদেন করার ফলে এই ব্যবসা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না অনেকে। কারণ কাঁচা টাকার লেনদেনের ফলে অনেকের ইচ্ছা এবং আগ্রহ থাকে যে, সে দ্রুত অনেক টাকার মালিক হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, যাদের তারা ধরছেন জেল থেকে বের হয়ে ফের একই কাজ করছে তারা। ৩০-৪০ বছর বয়সী লোকজন এই পেশায় জড়িত। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে কঠোর নীতি অনুসরণ করছেন তারা।

আরও পড়ুন

×