আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার
১৪০ নাট-বোল্ট খুলে নিয়েছে মাদকাসক্তরা
আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম নগরের আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারে স্টিল গার্ডার থেকে কমপক্ষে ১৪০টি নাট-বোল্ট ও ৫৩টি ওয়াশার খুলে নিয়েছে মাদকাসক্তরা। সিটি করপোরেশনের তদন্তে এ বিষয় ধরা পড়েছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে নগরের প্রধান সড়কের ওপর নির্মিত ফ্লাইওভারটি।
সিডিএর সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করে এই ফ্লাইওভার দিয়ে। সাত বছর আগে প্রায় সাতশ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এরপর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাইডলাইন অনুযায়ী, নাট-বোল্ট শিথিল হয়ে পড়েছে কিনা কিংবা কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কিনা, তা প্রতিবছর অন্তত একবার নিরীক্ষা করার কথা। সাত বছরে একবারের জন্যও নিরীক্ষা করেনি সিটি করপোরেশন। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ‘ফ্লাইওভার থেকে খুলে নিচ্ছে নাট-বোল্ট, নিরাপত্তা বেষ্টনী’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের ২ নম্বর গেট এলাকার বায়েজিদমুখী র্যাম্পে স্টিল গার্ডারের নাট-বোল্ট উধাও। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দুষ্কৃতকারী বা মাদকাসক্তদের দ্বারা নাট-বোল্ট চুরির ঘটনাটি সত্য মর্মে প্রতীয়মান হয়, যা উদ্বেগজনক। জিইসি থেকে বায়েজিদমুখী পিয়ার ক্যাপে ১৪০টি নাট-বোল্ট ও ৫৩টি ওয়াশার দুর্বৃত্তরা খুলে নিয়েছে। এগুলো দ্রুত গার্ডারের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা প্রয়োজন।’ নাট-বোল্ট দ্রুত সংযোজন না করলে ফ্লাইওভারের কাঠামোগত স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইওভারের উচ্চতা ও কাঠামোগত জটিলতার কারণে এগুলো পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ শ্রমিক এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি (যেমন–ক্রেন ও ম্যান-লিফট) প্রয়োজন। এ ধরনের সরঞ্জাম কিংবা প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকায় রুটিন পরিদর্শন কখনও হয়নি। ফ্লাইওভারের বিয়ারিং, ক্রস ব্রেসিং, জয়েন্ট প্লেট, পিয়ার ক্যাপ ও এক্সপানশন জয়েন্ট–এসব জায়গায় নাট-বোল্ট শিথিল বা অনুপস্থিত আছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। নাট-বোল্টগুলোর কারিগরি সক্ষমতাবিষয়ক একটি সনদ দেওয়া আবশ্যক।
প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদারে গঠিত কমিটি ১০ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লাইওভারগুলোর নাট-বোল্ট চুরি, অবহেলাজনিত ঝুঁকি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করা, আইনের আওতায় আনা। মাদকাসক্ত ও ভাসমান ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোবাইল টিম চালু করা। ফ্লাইওভারগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করে প্রতিবছর অন্তত ২০ শতাংশ স্টিল গার্ডার পরীক্ষা ও পাঁচ বছরে পূর্ণ নিরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিদর্শন কার্যক্রমে আধুনিক যন্ত্রপাতি (ডিজিটাল টর্ক রেঞ্চ, ম্যান-লিফট) ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বহদ্দারহাট, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারের নিয়মিত তদারকি, ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, মাদকসেবী তাড়ানো, সৌন্দর্যবর্ধন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি স্থাপন এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে সামাজিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে কমিটি।
তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিফাতুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘উড়াল সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে নাট-বোল্ট চুরি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। গার্ডারগুলো যে উচ্চতায় স্থাপিত, সেখান থেকে এসব খুলে নেওয়া অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। ভাসমান মাদকসেবীদের একটি চক্র এই চুরির সঙ্গে জড়িত। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ জন্য উড়াল সড়কে নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বাড়ার বিষয়ে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।’
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানান, ইতোমধ্যে চুরি হয়ে যাওয়া স্থানে নতুন করে নাট-বোল্ট স্থাপন করা হচ্ছে। দুর্বৃত্ত ও মাদকাসক্তদের প্রবেশ ঠেকাতে কাঁটাতার দেওয়া হয়েছে। বাকি সুপারিশগুলোও বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, ‘মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ২ নম্বর গেট এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি নির্মাণ শুরু হয়। ৬৯৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভারটি যান চলাচল শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৬ জুন। ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফ্লাইওভারটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়। তবে সাত বছর পার হলেও ফ্লাইওভারের কোনো বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বা নিরীক্ষা হয়নি। ফ্লাইওভারের নিচে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে করা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পও এখন ধ্বংসের মুখে। মরে গেছে ৯০ হাজার গাছ। চুরি গেছে এমএস গ্রিল ও আলোকসজ্জার খুঁটি।
