ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুবর্ণচরে চাঁন ফারুক, তোতলা বাহিনীর দাপট

সুবর্ণচরে চাঁন ফারুক, তোতলা বাহিনীর দাপট
×

আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৭ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর থানার অধীন মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন। শান্তির এই জনপদে এখন অশান্তি। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। গত বছরের আগস্টের পর থেকে চাঁন মিয়া ওরফে চান্দা, ফারুক ও তোতলা– এই তিন বাহিনীর নাম শোনা যাচ্ছে। এরা মাদক কারবার, খামারের গরু, মহিষ ও মাছ লুট করছে। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ২৪ অক্টোবর সরেজমিন অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তারা জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে চাঁন মিয়া বাহিনী, ফারুক বাহিনী এবং তোতলা বাহিনীর আবির্ভাব হয়। এর মধ্যে চাঁন মিয়া ও ফারুক বাহিনীর কাজ হলো স্থানীয় লোকজনের খামার থেকে গরু, মহিষ ও মাছ লুট করা। আর তোতলা বাহিনীর কাজ হলো চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলাসংলগ্ন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উড়িরচর থেকে নদীপথে মাদকের চালান মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ঘাটে আনা। এগুলো পরে মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন, উপজেলা সদর ও জেলার অন্য স্থানে বেচা।

অভিযোগ পেয়ে র‌্যাব-১১ নোয়াখালী কার্যালয়ের সদস্যরা গত সোমবার সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে চর ওয়াপদা ইউনিয়নের আল আমিন বাজার থেকে চান্দা ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে র‌্যাব-১১ নোয়াখালী ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানি কমান্ডার মিঠুন কুমার কুণ্ডু এসব তথ্য জানান।

র‌্যাব জানায়, চান্দা ডাকাত এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দিয়ে নিরীহ এলাকাবাসীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জুলুম, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি করে আসছিল। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করার জন্য অস্ত্র ও গুলি তার হেফাজতে রেখেছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়নবাসী জানায়, গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর চান্দা ডাকাত নির্বিচারে চাঁদাবাজি, স্থানীয় লোকজনের খামার থেকে গরু, মহিষ ও মাছ লুট করে। এসব বেচে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। তার ভয়ে এলাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি।

চর আলাউদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা নূর নবী বলেন, চাঁন মিয়া ও কালাম মাঝির ভাই মো. ফারুক মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরীর খামার থেকে সাত-আট দিন আগে ২০টি মহিষ, ১৫টি গরু ও বিভিন্ন প্রজেক্ট থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মাছ লুট করে নিয়ে গেছে। খামারের লোকজন অস্ত্রের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাধা দিতে পারেনি।

চর আকরামউদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন ও রুবেল বলেন, চাঁন মিয়া বাহিনী ও ফারুক বাহিনী চর আলাউদ্দিন এলাকায় আস্তানা গড়ে তুলেছে। ওই আস্তানা থেকে এসে সন্ধ্যার পর মানুষের গরু, মহিষ ও মাছ লুট করে নিয়ে যায়। রাতভর তারা গুলি ছুড়ে ও ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় ত্রাস ছড়ায়। ওই সন্ত্রাসী বাহিনী কয়েক মাস আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলুর খামারে লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় অভিযোগ হলে র‌্যাব চারজনকে আটক করে।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, চান্দা ডাকাত ও ফারুক বাহিনী সাত-আট দিন আগে আমার খামার থেকে ২০টি মহিষ, ১৫টি গরু ও বিভিন্ন প্রজেক্ট থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়। খামারের শ্রমিকদের থাকার ঘর কুপিয়ে ও পিটিয়ে বিনষ্ট করে বিদ্যুতের মিটার ভেঙে ফেলে। পুলিশ জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

চর আলাউদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাদাত উদ্দিন বলেন, শান্তির জনপদ ছিল মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন। চান্দা ডাকাত ও ফারুক বাহিনীর অত্যাচারে ইউনিয়নটি অশান্তির জনপদে পরিণত হয়েছে। এই দুই বাহিনী ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রজেক্টের পূর্ব পাশে ভূমিহীনদের বাড়ির সামনে লাল পতাকা উড়িয়ে প্রতি বাড়ি থেকে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে না পেরে দুই হাজার পরিবার বসতবাড়ি রেখে পালিয়ে গেছে।

ফারুক ও তোতলা বাহিনীর গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে গত ২৪ অক্টোবর মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সন্দ্বীপের পুরোনো লঞ্চঘাট এলাকায় স্থানীয়রা বিক্ষোভ মিছিল করে।

চরজব্বর থানা সূত্রে জানা যায়, চাঁন মিয়ার বিরুদ্ধে থানায় রোহিঙ্গা পাচারের একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। ফারুক বাহিনীর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। সব ক’টি মামলায় ফারুক জামিনে মুক্ত রয়েছেন। তবে তোতলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।

চান্দা বাহিনীপ্রধান চাঁন মিয়ার বড় ভাই ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. দিদার বলেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি পক্ষ মিথ্যাচার করছে। আমি কোনো সন্ত্রাসী কাজে জড়িত নই। আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি চুরির অভিযোগও নেই। ভাইকে ষড়যন্ত্র করে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে।

চর আকরাম উদ্দিন গ্রামের মৃত এনামুল হকের ছেলে মো. মহিউদ্দিন ওরফে তোতলা বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি। বেড়িবাঁধের ওপর থাকি। নিরক্ষর মানুষ। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে চলাফেরা করায় আমার দোকান ভেঙে দিয়েছে। চার মাস আমি কোনো কাজ করতে পারিনি। মাদক কারবারের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

চর আলাউদ্দিন গ্রামের মৃত আরব আলীর ছেলে মো. ফারুক আত্মগোপনে এবং মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএপির সিনিয়র এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে প্রতিনিয়ত অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়। মাদকের জমজমাট ব্যবসা, খামারের গরু-মহিষ-মাছ লুট করার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাঁর দাবি, চরজব্বর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাদের এসব কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, তোতলা বাহিনী চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলাসংলগ্ন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উরিরচর থেকে নদীপথে মাদকের চালান মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ঘাট দিয়ে সুবর্ণচর ও অন্য উপজেলায় পৌঁছে দেয়। তিনি সব বাহিনীর মূল উৎপাটন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান।

বিএনপি নেতা ও এলাকাবাসীর অভিযোগ অস্বীকার করে চরজব্বর থানার ওসি মো. শাহীন মিয়া বলেন, মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বাহিনী ও মাদক কারবার সম্পর্কে কিছুই জানি না। খামারের গরু-মহিষ-মাছ লুট সর্ম্পকেও জানি না। কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ না পেলে কীভাবে জানবো, প্রশ্ন করেন তিনি। সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেন না বলেও জানান তিনি।

 

আরও পড়ুন

×