ফটিকছড়িতে প্রতি রাতে টিলা কেটে সাবাড় করা হচ্ছে
ফটিকছড়ির দাঁতমারা এলাকায় কেটে ফেলা একটি টিলা। ছবি: সমকাল
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৭ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫২
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল ও রাবারবাগান এবং উত্তরাঞ্চলের দাঁতমারা ও বাগানবাজার ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতি রাতে পাহাড় ও টিলা কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। চলছে মাটি ও গাছ পাচার।
স্থানীয়রা জানান, এক সপ্তাহ ধরে স্থানীয় বিএনপি নেতার নেতৃত্বে দাঁতমারা ইউনিয়নের সরকারি খাসটিলা কেটে মাটি পাচার হচ্ছে। প্রকাশ্যে টিলা কর্তন হলেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। গত ২৬ অক্টোবর টিলা কাটার সময় মাটিচাপা পড়ে এক শ্রমিক নিহত হন। এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল মৌজার অধীনে ৪ নম্বর সিটের আওতায় বালুখালী চামাঘোনা মনাইয়ার দোকান এলাকায় দাঁতমারা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মামুনর রশিদ মামুনের নেতৃত্বে টিলা কাটা চলছে। এসব টিলার মাটি ট্রাকে করে যাচ্ছে ব্যবসায়ী শাহদাত হোসেনের মালিকানাধীন ফসলি জমি ও বালুখালী এলাকার গাছ ব্যবসায়ী মিয়া সওদাগরের ভিটা ভরাটের কাজে। টিলার গাছ কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়।
অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা মামুনর রশিদ মামুন বলেন, ‘মাটি কাটার কাজে আমি জড়িত নই। ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজম চৌধুরীর সঙ্গে রাজনীতি করার কারণে একটি গোষ্ঠী হীনস্বার্থে অপপ্রচার করছে।’
জানা যায়, সরকারি খাসটিলা ভূমি দখলদার সিরাজ গং এবং বিএনপি নেতা মামুনের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট টিলা কেটে সাবাড় করছে। শ্রমিক দিয়ে প্রতি রাতে টিলা কেটে মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে চলছে পরিবেশ বিধ্বংসী এ তৎপরতা।
টিলা কর্তনকারী চক্রকে শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজম চৌধুরী বলেন, ‘দাঁতমারা এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাটি কাটা চলছে, কারা এসব করছে তা জানা নেই। আমি রাজনীতি ও চা-বাগান নিয়ে ব্যস্ত, মাটি কাটার কাজে জড়িত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় ৫-৬ জন শ্রমিক মাটি কাটার সময় টিলার একাংশ ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়ে মো. আরিফ নামে এক শ্রমিক ঘটনাস্থলে নিহত হন। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা মামুন প্রশাসনকে না জানিয়ে প্রায় ১ ঘণ্টার চেষ্টায় মাটিচাপা পড়া মরদেহ উদ্ধার করে নিহতের বাড়িতে নিয়ে যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. পারভেজের মধ্যস্থতায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিহতের পরিবারকে ম্যানেজ করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করা হয়।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মো. পারভেজ বলেন, ‘আমি জনপ্রতিনিধি হয়ে পুলিশকে বাধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। নিহতের পরিবারের অভিযোগ না থাকায় লাশ ময়নাতদন্ত না করতে সহায়তা করেছি।’
সরকার পতনে সিন্ডিকেট পরিবর্তন
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর টিলা কাটা সিন্ডিকেটেও পরিবর্তন হয়েছে। আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শেল্টারে এলাকার পাহাড়, টিলা ও গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে।
সরকার পতনের পর স্থানীয় বিএনপির লোকজন সেই জায়গা দখল করেছেন। এখন তাদের শেল্টারে আগের মতোই নির্বিঘ্নে চলছে টিলা ও পাহাড় কেটে মাটি পাচার। এতে একদিকে যেমন এসব এলাকার পাহাড় ও টিলাভূমি বিলীন হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
এ ছাড়া রাতে টিলা কাটায় ব্যবহৃত অ্যাক্সক্যাভেটর ও মাটিবোঝাই ট্রাকের বিকট শব্দে এসব এলাকায় বসবাসকারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দাঁতমারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, বিএনপি রাজনীতিতে জড়িতদের পাহাড়-টিলা কর্তনসহ রাষ্ট্রীয় ক্ষতিসাধনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই। এসব কাজে কেউ জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা অঞ্চলের রিসার্চ অফিসার আশরাফ উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত টিলাগুলো পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- ফটিকছড়ি
- পাহাড় কাটা
