শিশু বিভাগ
চমেক হাসপাতালে ৬৪% শিশুর নিউমোনিয়া
আট দিনে ৯৫৮ রোগী ভর্তি, ৬২০ জনই নিউমোনিয়ার
রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগে একটি শয্যায় একসঙ্গে তিন থেকে চার শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সোমবার শিশু ওয়ার্ড থেকে তোলা -সমকাল
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে গত আট দিনে ভর্তি রোগীর ৬৪ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। পরিস্থিতি এতটা গুরুতর যে, একটি শয্যায় তিন-চার শিশুকে গাদাগাদি করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো শিশুকে দিনে ছয় থেকে আটবার নেবুলাইজ (শ্বাসযন্ত্রের ওষুধ প্রয়োগ) করতে হচ্ছে।
শিশু বিভাগ জানায়, গত ৯ দিনে ৯৫৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৬২০ জনই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১ থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত যথাক্রমে ১০৩, ১২৫, ১০৩, ১০৮, ১০২, ১১১, ৯৫, ১১৮ ও ৯৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত যথাক্রমে ৬৭, ৭২, ৬৯, ৭৩, ৬৫, ৭০, ৬৬, ৭০ ও ৬৫ জন। ১৫০ শয্যার এই বিভাগে গতকাল সোমবার ভর্তি ছিল ৪১০ শিশু।
গতকাল সরেজমিন শিশু ওয়ার্ডে কান্না-চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। এক নার্স শিশুর শরীরে স্যালাইন লাগাচ্ছেন, আরেক নার্স অন্য শিশুকে নেবুলাইজ করছেন। ওয়ার্ডের মধ্যভাগে থাকা ২১ নম্বর শয্যায় তিন শিশুকে পাশাপাশি রেখে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। তাদের একজন তিন মাসের আবদুর রহমান। তার বাঁ হাতে লাগানো হয়েছে স্যালাইন, মুখে নেবুলাইজ। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার হাজিপাড়া থেকে তাকে তিন দিন আগে ভর্তি করা হয়। শয্যার পাশে থাকা তার মা সুমি আক্তার বলেন, ‘ওর প্রচণ্ড কাশি। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। খেতে পারছে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া। তিন দিন ধরে চিকিৎসা নিলেও ভালো হচ্ছে না।’
আবদুর রহমানের পাশে চিকিৎসা নিচ্ছে যমজ দুই ভাই জাবেদ ও জুবায়ের। ৪২ দিন বয়সী দুই ভাইও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। তাদের মা হালিশহরের বাসিন্দা ববিতা বিবি বলেন, ‘দুই ছেলের প্রচণ্ড কাশি। স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বেশির ভাগ সময় কান্নাকাটি করে। দিনে ছয় থেকে আটবার নেবুলাইজ করাতে হচ্ছে। এখনও কাশি কমেনি।’
সাত মাস বয়সী ওমর ফারুককে নেবুলাইজ করতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় মা তানিয়া আক্তারকে। দুদিন আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার রহিমপুর থেকে আসেন তারা। তানিয়া আক্তার বলেন, ‘ওর শ্বাসকষ্ট বেশি, কফ বুকে জট হয়ে গেছে। কিছুই খেতে চাইছে না। ডাক্তাররা ছয় ঘণ্টা পরপর নেবুলাইজ করতে বলেছেন।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা সমকালকে বলেন, ‘কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ পাচ্ছি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। বিষয়টি উদ্বেগের। এক বছরের কম বয়সীরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ভাইরাল ফ্লুসহ নানা কারণে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক দেরিতে শিশুকে হাসপাতালে আনছেন। অনেকে আবার ইচ্ছামতো স্থানীয় ফার্মেসি থেকেও ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। এতে শিশুর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে।’
নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে চট্টগ্রামের বিশেষায়িত মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালেও। হাসপাতালটির তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে শিশু বিভাগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৭৮ জন।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বেসরকারি হাসপাতালসহ চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও। নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়মিত চেম্বার করা চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘শিশুদের একটি বড় অংশই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালের পাশাপাশি চেম্বারে আসা রোগীদের অর্ধেকের বেশি এ রোগে আক্রান্ত পাচ্ছি। বেশি জটিল হওয়া অনেক শিশুকে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই পরিবারে একাধিক শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে। কিছু মা-বাবা শিশুদের নিয়ে এখনও সচেতন নন। যে কারণে তারা সঠিক সময়ে চিকিৎসক দেখাচ্ছেন না। শরীরের অবস্থা জটিল হওয়ায় অনেক শিশুকে অনেকদিন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।’
