ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অরক্ষিত মৎস্য প্রজননকেন্দ্রে আস্তানা গেড়েছে মাদকসেবী

অরক্ষিত মৎস্য প্রজননকেন্দ্রে আস্তানা গেড়েছে মাদকসেবী
×

সাঁথিয়া মৎস্য প্রজননকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় চুরি হয়ে গেছে যন্ত্রাংশ, গাছপালা সমকাল

সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার সাঁথিয়া মৎস্য প্রজননকেন্দ্রে এক যুগ ধরে পোনা ও ডিম উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় চুরি হয়ে গেছে প্রজননকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের বিরুদ্ধে কেন্দ্র এলাকার গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে মৎস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তারা। 

সাঁথিয়া উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাঁথিয়ার নন্দনপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে যৌথ ব্যবস্থাপনায় প্রজননকেন্দ্রটি গড়ে তোলে মৎস্য অধিদপ্তর। প্রায় ৩৭ বিঘা জমিতে খনন করা হয় ১০টি পুকুর। 
স্থাপন করা হয় পানি সরবরাহের পাঁচটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প, আধুনিক আলোকবাতি, হ্যাচারিসহ পোনা উৎপাদনের আধুনিক ব্যবস্থা। ১৯৯৫ সালে ইছামতী নদীর দুই পারের ছয়টি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে  পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। এরপর বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি। 

২০০৬ সালে মাছ চাষের জন্য উপজেলা 
মৎস্য উন্নয়ন সমবায় সমিতি বার্ষিক ২৫ হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য এটি ইজারা নেয়। এরপর থেকেই প্রজননকেন্দ্রের দুরবস্থা শুরু হয়। চুরি 
হতে থাকে প্রকল্প এলাকার মাটি, গাছ থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক বাতি পর্যন্ত। ২০১১ সালে ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও তা আর নবায়ন করা হয়নি। 

এক পর্যায়ে কেন্দ্রটি অবৈধ দখলে নিয়ে ব্যক্তিগত খামার গড়েন তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর ছেলে বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আসিফ শামস রঞ্জন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দখল ফিরে পায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় প্রজননকেন্দ্র থেকে প্রতিবছর পাঁচ হাজার কেজি পোনা ও কমপক্ষে দুই হাজার কেজি 
রেণু উৎপাদন হলেও এখন তা সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। অবৈধ দখল আর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় চুরি হয়ে গেছে সেচপাম্প, মূল্যবান বৃক্ষ, সীমানা প্রাচীরের কাঁটাতার, অর্ধশত ফ্লাডলাইটসহ বৈদ্যুতিক পোল। শুকিয়ে গেছে পুকুর, লুট হয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
সরেজমিন নন্দনপুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা এক ভূতুড়ে পরিবেশ। কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই। আশপাশের গ্রামের কয়েকজন গরুর জন্য ঘাস কাটছেন। তারা জানান, বেশ কয়েক বছর আগেই সংঘবদ্ধ চক্র রাতে এখান থেকে গাছ কেটে নেওয়াসহ পাম্পের যন্ত্রাংশ ও বাতি চুরি করে নিয়েছে। 

কথা হয় নন্দনপুর গ্রামের মৎস্যজীবী সুশীল কুমার রাজবংশী হলদার, বাদল হলদার, সুনীল হলদার ও গৌরাঙ্গ হলদারের সঙ্গে। তারা বলেন, মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি যখন চালু ছিল তখন পোনা বিলে উন্মুক্তভাবে ছাড়া হয়েছে। মাছ বড় হওয়ার পর শিকার করে সংসারের খরচ চালিয়েছি। ১২ বছর প্রজনন কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। আমরা দ্রুত মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি চালুর দাবি করছি।  
জোড়গাছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও মাছ চাষি আনোয়ার হোসেন উল্লাস বলেন, সাঁথিয়ায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে যাত্রা হয়েছিল মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটির। প্রকল্প সম্প্রসারণ ও মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে দূরবর্তী বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হয়। এতে খরচ ও ভোগান্তি বাড়ে। প্রজননকেন্দ্রটি আধুনিকায়ন করে দ্রুত চালু করা হলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শামসুর রহমান বলেন, অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়ন করে মৎস্য খামারটির কার্যক্রম চালু করা হলে উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলায় রেণুর চাহিদা পূরণ হবে। সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। 
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বেড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর এটি চালু করতে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন

×