ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ত্রাণের রাজনীতি

ত্রাণের রাজনীতি
×

মায়মুনা

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে এক সময় বাংলার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত। কৃষকের মুখে ফুটত আশার হাসি; নদী ফিরে পেত প্রাণ; প্রকৃতি সেজে উঠত নতুন করে। কিন্তু আজ সেই বৃষ্টির শব্দ অনেকের কাছে আর সে রকম প্রত্যাশার কিছু নয়, বরং আতঙ্কের। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ এলাকা স্বাভাবিক সময়েও মৌসুমি বন্যার কবলে পড়তে পারে। উজানের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন– সব মিলিয়ে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। 

এই প্রাকৃতিক বাস্তবতা কখনও কখনও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়। এরপরও নীতিনির্ধারকরা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। গত সপ্তাহে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল ডুবে যাওয়ার অবস্থা। এ সমস্যা নতুন নয়। তবুও এ ব্যাপারে টেকসই কোনো সমাধান খোঁজা হচ্ছে না। সম্প্রতি জলাবদ্ধতা দেখা দিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ত্রাণ বিতরণ করেছেন। অথচ এ ব্যাপারে দলগুলোর স্থায়ী সমাধানের কোনো প্রস্তাব আমরা পাইনি। তাই ত্রাণের রাজনীতি নয়, বরং বন্যার আগের প্রস্তুতিই হতে হবে উন্নয়নের ভিত্তি। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য ত্রাণ বিতরণে নয়, বরং কত মানুষের জীবন ও জীবিকা আগেভাগে রক্ষা করা গেল, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।

দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙন ও বন্যার কবলে। অন্যদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়। ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে প্রতিটি অঞ্চলের ঝুঁকির ধরন ভিন্ন। হাওরাঞ্চল নিচু হওয়ায় মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা ঢলে দ্রুত প্লাবিত হয়। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চল যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল হওয়ায় নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। অথচ আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রায়ই হয় এক ছাঁচে গড়া। ফলে স্থানভেদে উপযোগী সমাধান গড়ে ওঠে না।
বন্যার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি বা উজানের পানিকে দায়ী করলে বাস্তবতার বড় একটি অংশ আড়াল হয়ে যায়। বহু নদী আজ দখল, ভরাট ও দূষণের শিকার। অসংখ্য খাল, জলাধার এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বিলীন হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবৈধ স্থাপনা বৃষ্টির পানি আটকে দেয়। কোথাও বাঁধ নির্মাণ করা হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার কোথাও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণকালে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ বিবেচনাতেই নেওয়া হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

বন্যা কেবল ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দেয় না; মানুষের ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করে। গত সপ্তাহে কক্সবাজারে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসে মোট ৩২ জন নিহত হয়েছে। একটি বন্যা বহু পরিবারের জন্য দারিদ্র্যের ফাঁদকে আরও গভীর করে তোলে। তাই সমাধান খুঁজতে নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূল ও শহরের জন্য আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। 
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নদী দখল ও জলাভূমি ভরাটের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত খনন কাজ জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, প্রকৃতিকে বুঝে তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজলেই জয় সম্ভব। প্রতি বর্ষায় একই মানুষের কান্না, কৃষকের ভেসে যাওয়া ফসল কিংবা শিশুর হারিয়ে যাওয়া বই কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নিয়তি হতে পারে না। যদি প্রতিবছর একইভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা প্রকৃতির দোষ নয়, আমাদের নীতি ও জবাবদিহির ব্যর্থতা। 

মায়মুনা: শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
[email protected]

আরও পড়ুন

×