ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

রাজনীতি

সুশাসনের দাবি ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জে সরকার 

সুশাসনের দাবি ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জে সরকার 
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসা সরকারের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়াটা বড় মাইলফলক নয়। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠছে– কেমন গেল সময়টা! আগে নতুন সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণার রেওয়াজ ছিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কিছু কর্মসূচি রয়েছে। পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে কিছু সাফল্যের বিবরণও। এই সময়ে সরকার চাইলেও কী কী করতে পারেনি, তার বিবরণও দেওয়া যেত। মানুষ তাহলে মিলিয়ে দেখতে পারত, তাদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সেটা কতখানি যায়। 

প্রতিটি সরকার এসেই বলে, খুবই খারাপ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়েও একই বক্তব্য দেওয়া হতো। বর্তমান সরকার তো দায়িত্ব নিয়েছে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী শাসনামলের অস্থির পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারও বলেছিল, তারা ধ্বংসের কিনারে থাকা দেশ পেয়েছে। আগে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। কিন্তু সেটা আসেনি। দু-একটি বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা বরং বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে যে ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’ উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল, সেটা ফিরিয়ে আনাও কম নয়। বর্তমান সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এমনটিও বলা হয়েছে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় তারা ছিলেন; নইলে হয়তো নির্বাচনটাও মিলত না। তবে দেশের মানুষ নিশ্চয় ভোট দিতে পেরেই তুষ্ট নয়। তারা দেখতে চাইছে দেশটিকে স্থিতিশীল করে সুশাসনের দিকে নিয়ে যেতে সরকারের আন্তরিকতা। যত দিন যাবে, ততই বিষয়টি সমালোচনামূলক দৃষ্টিতেই দেখতে চাইবে তারা। ক্ষমতাসীন দলের একনিষ্ঠ সমর্থকদের কথা অবশ্য আলাদা। 

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্বভাবতই ভালো ভালো কথা ছিল। যারা সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিষয়টিও অভিন্ন। তবে তাদের অঙ্গীকার লোকে ভুলে গেছে। বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকার দিকে অবশ্য দৃষ্টি থাকবে মানুষের। সময়ে সময়ে নানা ইস্যুতে রাজপথে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন তারা। তবে মানুষের প্রত্যাশা– রাজপথ উত্তপ্ত না হোক। তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা সুশাসনের। সেটা সরকারেরই দেওয়ার কথা। আর সুশাসন প্রতিদিনের কাজ; শুধু নির্বাচনী অঙ্গীকারেরও বিষয় নয়। এটা যে কোনো সরকারের স্বাভাবিক দায়িত্ব। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছেও চাওয়া হয় সুশাসন। স্বৈরশাসকরাও সুশাসন নিশ্চিতের কথা বলেন; যদিও জবাবদিহির অভাবে সেটা করতে তারা সাধারণত ব্যর্থ হন।  

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধেও ব্যক্ত হয়েছিল একই প্রত্যাশা। সেটা অবশ্য বারবার হোঁচট খেয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিতরাও সুশাসন জোগাতে পারেননি। জবাবদিহির বাইরেও চলে গেছেন বারবার। শেষে নির্বাচন ব্যবস্থাও তারা বিনষ্ট করেছেন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল শেখ হাসিনা সরকার। দেশ যাতে সেদিকে আর না যায়, এটা নিশ্চিত করাটা হলো পরিবর্তিত বাস্তবতায় ন্যূনতম লক্ষ্য। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনেই। এটা ঘিরে সহিংসতা যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর নির্বাচনটাও সুষ্ঠু হয়। নইলে এ কথাটিও উঠবে– স্থানীয় নির্বাচনগুলো তাহলে আমরা সুষ্ঠু করব কীভাবে! 

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যেগুলো তাদের সৃষ্ট নয় কিংবা এসেছে বাইরে থেকে। হাম ও জ্বালানি পরিস্থিতি যেমন। সামনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি গেলবারের চেয়েও খারাপ হতে পারে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। শহরাঞ্চল থেকে এটা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলেও। অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় খুব বেশি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর প্রভাব রয়েছে পণ্যবাজারে। মূল্যস্ফীতিতে এটা প্রতিফলিত হচ্ছে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই। সরকার মোটামুটি সব পক্ষকে খুশি করে একটা ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রদানে সাফল্য দেখিয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সুকঠিন। বাজেট দিয়েই তো সব সমস্যা ‘অ্যাড্রেস’ করা যাবে না। সে জন্য এক অর্থবছরও যথেষ্ট নয়। 

সরকারের প্রথম ১৮ মাসে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছিল বিএনপি। তার ধারেকাছেও যাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। বিভিন্ন খাতে কর্মচ্যুতির ঘটনা বরং উদ্বেগজনক। এক বছরেও নতুন বিনিয়োগে কতখানি অগ্রগতি হবে– জোরেশোরে বলা যাচ্ছে না। যদিও সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা সাহস করেই বলা হয়েছে বাজেটে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় ঢুকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল বলে গেছে, সুনির্দিষ্ট সংস্কারগুলো না হলে সাড়ে ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে প্রবৃদ্ধি। তার মানে, সেটা হবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম! 

এদিকে, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি কমজোরি হয়ে পড়েছে। সরকার অবশ্য বলে যাচ্ছে, জুলাই সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়ন করা হবে। সংস্কার প্রশ্নে কম আশাবাদীদের দাবি– বিএনপি এ ক্ষেত্রে নিজ অঙ্গীকারটুকু বাস্তবায়ন করে দেখাক। যেসব প্রশ্নে মাঠে থাকা সব পক্ষ একমত হয়েছিল, কেবল সেগুলোর বাস্তবায়ন হলেও ইস্যুটির একটা গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি হয়। গত পাঁচ মাসে এ ক্ষেত্রে সরকার যা যা করেছে, সে বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা অবগত। সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির পর সামনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংসদে কিছু কাজ করতে হবে। এটাও সরকারের জন্য পরীক্ষা। 
নীতিগত এসব প্রশ্নে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যদিনের সুশাসনে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখাতে হবে সরকারকে। প্রশাসনসহ সরকারি খাতে বেতন বাড়ছে চলতি মাস থেকে। এ অবস্থায় জনকল্যাণে কিছুটা হলেও নিয়োজিত করতে হবে প্রশাসনকে। তাদের হাতে বেসরকারি খাতের মানুষজন হেনস্তা হওয়ার বদলে যেন কিছু সেবা পান। বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে কিন্তু ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ব্যাংক খাত এখনও দুর্দশায়। খাতটিতে লুটেরাদের প্রত্যাবর্তনের শঙ্কা দূর করতে অবশ্য দেরিতে হলেও এগিয়ে এসেছে সরকার; আইন সংশোধন করে। এমনতর শঙ্কাই বা কেন জন্মাতে দেওয়া হয়েছিল, বোধগম্য নয়। 

গত পাঁচ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে; গোটা সরকারের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হতে হবে। মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট না হলেও এটুকু সময়েই কিন্তু সরকারের বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক ছিল না। সরকারের কাজ অবশ্য কেবল বিতর্ক এড়িয়ে চলা নয়; সুশাসন দিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করা; আশা ও সাহস জাগানো। সংস্কারে ধীরে এগোতে চাওয়ার কারণ তো অবোধগম্য নয়। সংস্কার প্রক্রিয়া সরকারকে সুশাসন দিতে সক্ষম করে তুলবে, এটাও বলা হয়ে থাকে। সমালোচনার চাপ কম থাকাকালে কিছু ‘অপ্রিয় সংস্কার’ করে ফেলা যেত বলেও মত অনেকের। সংস্কার, এমনকি সুশাসন দেওয়ার চেষ্টা ক্ষমতাসীনদের ভেতর থেকেও প্রতিরোধের মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর ‘কোর টিম’ এ বিষয়ে কতটা সতর্ক, দেখার বিষয়।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×