লং মার্চ
বিরোধী দল কেন রাজপথে যেতে আগ্রহী
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস যেতে না যেতেই লংমার্চের মতো কর্মসূচিতে চলে যাওয়া জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সঠিক হয়েছে কিনা– সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে নিজ পছন্দমতো কর্মসূচি গ্রহণের অধিকার তাদের রয়েছে। সামনে আরও তিনটি লংমার্চ। শেষে রাজধানীতে হবে তাদের মহাসমাবেশ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি সংসদে তারা একই দাবিতে বক্তব্য রাখছে।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, এটা স্বাভাবিক। সংসদে সেটা করার সুযোগ তাদের থাকতে হবে। এমন সুযোগ যত বাড়ে, ততই গণতন্ত্রের জন্য ভালো। সংসদীয় কমিটিগুলোতেও তাদের ভূমিকা পালনের সুযোগ রাখতে হবে। এখনও সব সংসদীয় কমিটি অবশ্য গঠিত হয়নি। আরও লক্ষণীয়, মাত্র একটি কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলকে। তাদের বিরুদ্ধেও অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে সরকারপক্ষের। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল যোগ দেয়নি কেন– এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। তবে অধিবেশনে আলোচনার সুযোগ তারা কম পাচ্ছেন না। লংমার্চ থেকে ফিরে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখার সুযোগের সদ্ব্যবহারও তারা করেছেন।
সংসদে যথেষ্ট সুযোগ লাভের পরও কেন তারা রাজপথে যেতে আগ্রহী– সে প্রশ্ন স্বভাবতই উঠেছে। তবে লংমার্চ ঘিরে ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে বেশ কিছু পথসভা এবং শেষে জনসভা হয়েছে। কোথাও বাধাদানের ঘটনা ঘটেনি। জনপ্রশাসনও অসহযোগিতা করেনি বলে প্রতীয়মান। ওই রকম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে তীব্র যানজটও সৃষ্টি হয়নি। ছুটির দিনে কর্মসূচি পালন এর বড় কারণ। সাধারণ মানুষও হয়তো ওই পথ সেদিন কম ব্যবহার করেছে।
এ অভিজ্ঞতা যেন পরবর্তী কর্মসূচি পালনে সহায়ক হয়। জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার চাহিদা অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছে; যদিও রাজনৈতিক দলগুলো কর্ণপাত করেনি। আবার স্বাভাবিক কর্মসূচিতে বাধাদান, এমনকি তা ভন্ডুলের প্রবণতাও দেখেছি অতীতে। রাস্তার পাশে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দমনপীড়নের এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা মানুষকে এক পর্যায়ে বড় প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যায়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছিল এরই পরিণতি। সেখান থেকে সবারই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
লংমার্চে সাধারণ মানুষের সাড়া কেমন মিলেছে, সেটা অবশ্য বলা কঠিন। বিগত নির্বাচনে বিরোধী দল উল্লেখযোগ্য ভোট ও আসন পেয়েছে, সন্দেহ নেই। ইত্যবসরে তাদের জনসমর্থন বাড়তেও পারে। লংমার্চের সভাগুলোয় লোকসমাগম ভালোই হয়েছে। তারপরও স্পষ্ট নয়, এতে কর্মী-সমর্থকের বাইরে জনসাধারণ কতটা অংশ নিয়েছে। বিশেষত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে মানুষ খারাপ আছে বৈ কি।
আইনশৃঙ্খলায়ও উন্নতির বদলে অবনতি বেশি লক্ষণীয়। আমনের ভরা মৌসুমে সার নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির খবরও কম নেই। পণ্যবাজার পরিস্থিতি নতুন করে অবনতির দিকে গেছে। কিন্তু সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার যে সচেষ্ট, সেটাও নিশ্চয় লক্ষ্য করছে মানুষ। সিংহভাগ সংকট যে অতীত থেকে পরিবাহিত, সেটা বোঝার সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রত্যাশাও তাদের অনেকের মধ্যে কাজ করবে বলে ধারণা। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের এসব জানা নেই, সেটাও বলা যাবে না। নিজেরা ক্ষমতায় থাকলে এর মধ্যে কতটা কী করতে পারতেন, সেই মূল্যায়নও নিশ্চয় তাদের মধ্যে রয়েছে। তারপরও উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা সরকারকে অজনপ্রিয় করতে চাইবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছেন; এর কয়টি আদায়যোগ্য, সেই বুঝও নিশ্চয় তাদের মধ্যে রয়েছে। জুলাই সনদের যেসব প্রশ্নে বিএনপি একমত হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নেও তাদের অনাগ্রহী দেখা যাচ্ছে– এটা বিরোধী দলের বক্তব্য। লংমার্চেও এ জন্য ক্ষমতাসীনদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। কেউ কেউ ছয় দফার আন্দোলনটি সরকার পতনের এক দফার দিকে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন। হতে পারে এগুলো ‘মেঠো বক্তৃতা’। তবে রাষ্ট্র সংস্কারে ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা যে এতে রয়েছে, কোনো সন্দেহ নেই।

বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে আছে। ইতোমধ্যে তারা রাষ্ট্রপতি বেছে নিয়েছে জুলাই সনদ নির্দেশিত পথ অনুসরণ না করে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোও নিজেদের মতো গ্রহণ-বর্জন কিংবা সংশোধন করছে। সর্বশেষ মানবাধিকার ও গুম কমিশন বিল পাসের সময় বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছে। এর বাইরে আসলে কিছু করার নেই তাদের। এ অবস্থাতেই রাজপথে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
এদিকে আসছে শীতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো শুরু হবে একে একে। সেটা সামনে রেখেও চলমান সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে অজনপ্রিয় করা এবং নিজেদের জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো হয়তো তাদের লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকা অবস্থায় বিরোধী দল হিসেবে তারা কার্যকর ভূমিকা না রেখে সরকারের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে চলছে বলে আলোচনা রয়েছে। একের পর এক লংমার্চে সরকারের তীব্র সমালোচনায় সেই ‘অস্বস্তিকর ধারণা’ দূর করাও হয়তো তাদের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য।
গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশায় বড় পরিবর্তন এসেছে, সন্দেহ নেই। যে কোনো বড় পালাবদলে এটা ঘটে থাকে। মানুষের হতাশ হওয়ার অভিজ্ঞতাও কম নয়। সে কারণে প্রত্যাশা সীমিত রাখার পক্ষে মত দিয়ে থাকেন অনেকে। তবে কিছু প্রত্যাশা মানুষ রাখে সব সরকারের কাছেই। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও সেটা ছিল।
দেশের মানুষ প্রথমত চায় জীবনের নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, কাজের সুযোগ। তৃতীয়ত, স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি। হালে আবার বেশি করে সামনে এসেছে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি। এটা যে জরুরি, তা কাউকে আর বলে দিতে হচ্ছে না। জ্বালানি সংকটে খাদ্য নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে– এটা মানুষ পরিষ্কার বোঝে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাও তারা বিচার করছে প্রতি মুহূর্তে। এসব ইস্যুতে বিরোধী দলের অবস্থানও তারা মূল্যায়ন করছে নিশ্চয়। সরকার ব্যর্থ হলে তার উপযুক্ত সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প পথনির্দেশ তারা করবে– এটাও জনগণের প্রত্যাশা।
লংমার্চ শুরুর আগে ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকেও কিন্তু ‘বিকল্প প্রস্তাব’ চাওয়া হয়েছে, বিশেষত জ্বালানি সংকট বিষয়ে। তবে প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগে সরকার কেন অকৃত্রিম দলীয়করণের মনোভাব দেখিয়েই যাচ্ছে– সদুত্তর নেই। বিগত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে যেটুকু বলিষ্ঠতা দেখানো যেত, সেই পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণও অজানা। বিরোধী দল পারত আলাদা করে সেই প্রশ্নগুলো সামনে আনতে, যেগুলোর নিষ্পত্তিতে অর্থকড়ির আবশ্যকতা তেমন নেই কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয় না। কিছু সংস্কার তো ইতোমধ্যে করাই যেত, যেগুলো সরকারের ক্ষমতার বদলে জবাবদিহির সুযোগ বাড়ায়। আমরা নিশ্চয়ই চাই সরকারের বদলে জনগণকে বেশি শক্তিশালী করতে। বিরোধী দল ঠিকমতো কাজ করলে তারাও শক্তিশালী হতে পারবে। গণতন্ত্রে বিরোধী দল শক্তিশালী হওয়াটাও অনেক সময় জনস্বার্থের অনুকূলে গিয়ে থাকে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- রাজপথ
- বিরোধী দল