ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ

শুধু বিদেশ গমন নয়, বিশ্বকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হোক

শুধু বিদেশ গমন নয়, বিশ্বকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হোক
×

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কিংবা জার্মানিতে গেলে এটি আন্তর্জাতিকীকরণের একটি দিক। কিন্তু একজন জার্মান গবেষক যদি বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে এসে বাংলাদেশি গবেষকের সঙ্গে কাজ করেন, একজন জাপানি অধ্যাপক যদি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেন, বাংলাদেশের একজন গবেষক যদি নেদারল্যান্ডসের সহকর্মীর সঙ্গে নদী ও জলবায়ু নিয়ে যৌথ গবেষণা করেন কিংবা বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী বিদেশে না গিয়েও ইউরোপের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনলাইন যৌথ প্রকল্পে কাজ করেন– এসবও উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ। আন্তর্জাতিকীকরণের প্রকৃত শক্তি এখানেই: শুধু বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে যাওয়া নয়, বিশ্বকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এই ধারণা এখন নীতিগত গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক ও গবেষণা কার্যালয়’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ২৫ আগস্ট ইউজিসিতে আয়োজিত ‘ইরাসমাস প্লাস তথ্য অধিবেশন’-এ ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, এসব অফিসের মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা, যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রি, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, যৌথ গবেষণাগার ও উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ বহুমুখী সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিকীকরণকে শুধু শিক্ষার্থী বিদেশে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও সহযোগিতা কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। কারণ বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষা আর কোনো দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নেই। গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, জ্ঞান উৎপাদন ও দক্ষ মানবসম্পদ ক্রমেই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি এখন শুধু তার শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা ভবনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তার আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, জ্ঞান বিনিময় এবং বৈশ্বিক সমস্যায় অবদান রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ কী

উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ মানে শুধু কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং শিক্ষার্থী বিনিময় নয়। আন্তর্জাতিকীকরণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী উন্নয়ন, প্রশাসন ও উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক, আন্তঃসাংস্কৃতিক ও বৈশ্বিক মাত্রা যুক্ত করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর একটি দিক ‘আন্তর্জাতিকীকরণ বিদেশে’– বিদেশে পড়াশোনা, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা যৌথ ডিগ্রি। অন্য দিকটি ‘দেশে থেকেই আন্তর্জাতিকীকরণ’। অর্থাৎ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেই একজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।
এই দ্বিতীয় দিকটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পক্ষে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের সবাইকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বাইরে রাখা উচিত নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো, অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনলাইন যৌথ প্রকল্প করা, আন্তর্জাতিক অতিথি বক্তৃতা আয়োজন, বিদেশি গবেষকের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম তৈরি কিংবা সহযোগিতামূলক অনলাইন আন্তর্জাতিক শিক্ষা চালু করা– এসবের মাধ্যমে দেশে থেকেই আন্তর্জাতিকীকরণ সম্ভব।
বিশ্বের অনেক দেশ এই আন্তর্জাতিকীকরণকে জাতীয় কৌশলের অংশ করেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণকে উচ্চশিক্ষা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইরাসমাস প্লাস শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের চলাচল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। এশিয়ায় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ও যৌথ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গন্তব্যে পরিণত করেছে। সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক গবেষণা, বিদেশি শিক্ষক-গবেষক এবং বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, ভারত ও ভিয়েতনামও আন্তর্জাতিক গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার উপযোগী মডেল
বাংলাদেশের জন্য বিদেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা উচিত নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে একটি ‘বাংলাদেশি আন্তর্জাতিকীকরণ মডেল’ তৈরি করা প্রয়োজন। এর মূল লক্ষ্য হতে পারে– বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনের প্রতি দায়বদ্ধ একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা।
প্রথমত, আন্তর্জাতিকীকরণ উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তুলনামূলক মান নির্ধারণ, সমপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, এটি গবেষণার সুযোগ বাড়াবে। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষক ও গবেষক মেধাবী হলেও উন্নত গবেষণাগার, গবেষণা অর্থায়ন, তথ্য-উপাত্ত এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, বন্যা, নগরায়ণ, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা– এসব বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশ্বের উন্নত গবেষণা ও প্রযুক্তিকে যুক্ত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকীকরণের অর্থ তখন শুধু ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক’ নয়; বরং দেশের সমস্যা সমাধানে বৈশ্বিক জ্ঞান ব্যবহার।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিকীকরণ শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করবে। আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, আন্তঃসাংস্কৃতিক দক্ষতা, দলগত কাজ, ডিজিটাল দক্ষতা, গবেষণা দক্ষতা এবং বৈশ্বিক নাগরিকত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শিক্ষার মাধ্যম যখন চ্যালেঞ্জ
এই পথে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার মাধ্যম। আন্তর্জাতিক গবেষণা, একাডেমিক প্রকাশনা, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং বৈশ্বিক একাডেমিক যোগাযোগের বড় অংশ ইংরেজিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিকীকরণে এগোতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ইংরেজি দক্ষতা বাড়াতে হবে। তবে এর অর্থ বাংলা বাদ দেওয়া নয়। বাংলা আমাদের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজের ভাষা। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক মডেল, যেখানে স্থানীয় জ্ঞান বাংলায় শক্তিশালীভাবে চর্চা হবে এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজিতে দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাডেমিক ইংরেজি, গবেষণা লেখা, গবেষণা অনুদানের আবেদনপত্র লেখা, উপস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে কথা বলতে পারে কিনা, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়; সে আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র বুঝতে পারে কিনা, গবেষণা প্রস্তাব লিখতে পারে কিনা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা উপস্থাপন করতে পারে কিনা, এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

ভিসা সহজ করা ও ক্যাম্পাস স্থিতিশীলতার দায়
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিকীকরণ দ্বিমুখী। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেমন বিদেশে যাবে, তেমনি বিদেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের বাংলাদেশে আসতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন দেশে ভিসা আবেদন, সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ, নথিপত্র যাচাই এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বড় সমস্যা সৃষ্টি করছে। বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরাও কখনও ভিসা জটিলতার কারণে সময়মতো বিদেশে যেতে পারছেন না।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে চায়, তাহলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসা ব্যবস্থা প্রয়োজন। একজন বিদেশি শিক্ষার্থী যদি ভর্তি হওয়ার পর ভিসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, তাহলে তিনি অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিতে পারেন। তাই ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং সময়সীমাভিত্তিক শিক্ষার্থী ও গবেষক ভিসা সেবা চালু করা জরুরি।
আন্তর্জাতিকীকরণের আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় হলো ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা ও একাডেমিক স্থিতিশীলতা। বিদেশি শিক্ষার্থী বা গবেষক বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে শুধু র‌্যাঙ্কিং বা শিক্ষা ব্যয় দেখবেন না; ক্যাম্পাস কতটা নিরাপদ, ক্লাস নিয়মিত হয় কিনা, রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয় কিনা, আবাসিক হল কতটা নিরাপদ এবং একাডেমিক স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত– এসবও বিবেচনা করবেন।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অতীতে রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকীকরণের পথে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ, স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও একাডেমিকভাবে প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার অবশ্যই থাকবে; কিন্তু মতপার্থক্য যেন সহিংসতা, ভয়ভীতি বা একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত করার কারণ না হয়, সেই সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু উদ্যোগ থেকে এখানে শেখার সুযোগ রয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি  এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যৌথ গবেষণা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বহুজাতিক শিক্ষার্থী সমাজ বিশেষভাবে দেশে থেকেই আন্তর্জাতিকীকরণের একটি কার্যকর উদাহরণ।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগগুলোকে প্রচারণার দৃষ্টিতে নয়, ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কতটি সমঝোতা স্মারক আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতটি কার্যকর অংশীদারিত্ব রয়েছে; কতটি যৌথ গবেষণা হয়েছে, কতজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক চলাচলে অংশ নিয়েছে, কতটি যৌথ ডিগ্রি চালু হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষণফল কী– এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি।
মেডিকেল শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী পড়ছে। কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানোই আন্তর্জাতিকীকরণের শেষ কথা নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, চিকিৎসা গবেষণা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অংশীদারিত্ব, গবেষণা প্রকাশনা, আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসাশিক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সংযোগ প্রয়োজন।
এখানে ইউজিসির প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ও গবেষণা কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই অফিস যেন শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চিঠিপত্র চালাচালির প্রশাসনিক শাখা না হয়। এর দায়িত্বের মধ্যে থাকতে পারে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি ও সহায়তা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক চলাচল, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রি, অতিথি গবেষক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভিসা সহায়তা এবং একাডেমিক প্রবাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
এসব অফিসের জন্য দক্ষ পেশাদার জনবল ও নির্দিষ্ট বাজেট প্রয়োজন। একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক অফিস চালালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদানের প্রস্তাব লেখা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেবা এবং একাডেমিক চলাচল ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।

‘মেধা পাচার’ বনাম ‘মেধার আবর্তন’

বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বড় সম্পদ হলো বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীরা। তাদের শুধু ‘মেধা পাচার’ হিসেবে না দেখে ‘মেধার আবর্তন’-এর অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি অধ্যাপক ও গবেষকদের অতিথি অধ্যাপক, সংযুক্ত শিক্ষক, যৌথ তত্ত্বাবধায়ক, গবেষণা সহযোগী বা পরামর্শক হিসেবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। তাদের আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য বড় সম্পদ হতে পারে। এ জন্য একটি জাতীয় একাডেমিক প্রবাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে বিনিময় কর্মসূচি বা আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ যদি কেবল সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিকীকরণ উচ্চশিক্ষায় নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে। তাই বৃত্তি, চলাচল অনুদান ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নমধ্যম আয়ের শিক্ষার্থীদেরও আন্তর্জাতিক সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে আন্তর্জাতিকীকরণ যেন শুধু ঢাকা ও কয়েকটি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা সমান নয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক গবেষণায় শক্তিশালী হতে পারে, কোনোটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে, কোনোটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আঞ্চলিক উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে এবং কোনোটি পাঠ্যক্রমের আন্তর্জাতিকীকরণ বা ভার্চুয়াল বিনিময়ে। তাই সবার জন্য একই লক্ষ্য নির্ধারণ না করে সক্ষমতাভিত্তিক আন্তর্জাতিকীকরণ প্রয়োজন।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি। বাংলাদেশে জাতীয় উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিকীকরণ নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আন্তর্জাতিকীকরণ কৌশল থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, বিদেশি শিক্ষার্থী, যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, শিক্ষার্থী-শিক্ষক চলাচল, যৌথ ডিগ্রি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

‘বাংলাদেশে পড়ুন’ উদ্যোগ
বাংলাদেশের জন্য ‘বাংলাদেশে পড়ুন’ নামে একটি জাতীয় উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। কেন একজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসবে– এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর তৈরি করতে হবে। সাশ্রয়ী ব্যয়, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, নিরাপদ ক্যাম্পাস, আন্তর্জাতিক শিক্ষক, সহজ ভিসা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং পড়াশোনা শেষে সম্ভাব্য কর্মজীবনের সুযোগ– সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনতে হবে।
আন্তর্জাতিকীকরণের সাফল্য পরিমাপেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং দিয়ে সাফল্য মাপা যাবে না। কতটি সক্রিয় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, কতটি যৌথ গবেষণা প্রকাশনা, কত আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, কতজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, কতটি শিক্ষার্থী-শিক্ষক চলাচল কর্মসূচি, কতটি যৌথ বা দ্বৈত ডিগ্রি, কতটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং এসবের মাধ্যমে কী শিক্ষণ ও গবেষণার ফল তৈরি হয়েছে– এসব হওয়া উচিত মূল সূচক।
সব শেষে মনে রাখতে হবে আন্তর্জাতিকীকরণ কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক হয়, যখন তার একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের অন্য দেশের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করতে পারে; একজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক গবেষণা দলে যুক্ত হতে পারেন; একজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এসে নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা পেতে পারেন; বিদেশে থাকা একজন বাংলাদেশি গবেষক দেশের গবেষণায় অবদান রাখতে পারেন; এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থানীয় সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ তাই শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত– বিশ্বের জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি ও মেধার সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা সমমর্যাদায় যুক্ত হতে পারছে?
ইউজিসির প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক ও গবেষণা কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন প্রয়োজন কাগজের সমঝোতা স্মারক থেকে কার্যকর অংশীদারিত্বে, বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থী-শিক্ষক চলাচল থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে, মেধা পাচার থেকে মেধার আবর্তনে এবং বিদেশমুখী উচ্চশিক্ষা থেকে বিশ্বসংযুক্ত উচ্চশিক্ষায় উত্তরণ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বিশ্বকে নিজের ক্যাম্পাসে আমন্ত্রণ জানানো জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিকীকরণের সাফল্য তখনই আসবে, যখন আমরা শুধু বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়াব না– বিশ্বের জ্ঞান, মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশকেও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারব।

ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ: অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×