উন্নয়ন
ভোলার মানুষ এবার সেতুর দুঃখ ভুলতে চায়
শতরূপা দে
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
খবরটি আশাজাগানিয়া– ‘দ্বীপ জেলা ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়’ (সমকাল, ২২ আগস্ট ২০২৬)।
জাতীয় রাজনীতিতে ও সরকারে ভোলার প্রতিনিধিত্ব স্বাধীনতার পর থেকেই প্রথম সারিতে। বর্তমানেও চারটি সংসদীয় আসনের এই জেলা জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং একজন পূর্ণমন্ত্রী পেয়েছে। ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচিত হলেও আরেকজন প্রতিমন্ত্রী ভোলারই সন্তান। অতীতেও মন্ত্রিসভায় ভোলার একাধিক সন্তান স্থান পেয়েছেন। কিন্তু দ্বীপ জেলাটির জন্য একটি সেতুর অপেক্ষা সম্ভবত এই প্রথম শেষ হতে যাচ্ছে।
প্রায় ২২ লাখ মানুষের এই জনপদ নদীবেষ্টিত; বরিশাল হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে নির্ভর করতে হয় ফেরি ও নৌপথের ওপর। আবহাওয়া খারাপ হলে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় জরুরি রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ সবাইকে। এই বাস্তবতার ভেতরে ভোলা-বরিশাল সেতুর স্বপ্ন বহু দশক ধরে বেড়ে উঠেছে।
১৯৮৬ সালে ভোলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নাজিউর রহমান মঞ্জুর যেমন ভোলার জন্য কাজ করেছেন; তেমনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী মুখ এবং ভোলার এমপি তোফায়েল আহমেদ ১৯৯৬ সালে মন্ত্রী হওয়ার পর ভোলা-বরিশাল সরাসরি সড়ক সংযোগ, ভোলার শিল্পায়ন এবং গ্যাস সম্পদের সদ্ব্যবহার নিয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-বরিশাল সেতু ও গ্যাস সংযোগের প্রশ্নকে নির্বাচনী অঙ্গীকারে পরিণত করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ভোলার উন্নয়নের প্রধান শর্ত স্থায়ী সড়ক সংযোগ। সেতু শুধু যোগাযোগ নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পূর্বশর্ত।
বস্তুত ভোলার বিভিন্ন আসন থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা সংসদ সদস্য হলেও কৃষি উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সবার প্রধান প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে ভোলা-বরিশাল সেতু। চরাঞ্চলে সড়ক নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বিদ্যুতায়ন– এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও প্রতিটি নির্বাচনে ঘুরেফিরে আসে ভোলা-বরিশাল সেতু। নির্বাচনী ইশতেহার, জনসভা, পোস্টারে সেতু যেন এক স্থায়ী প্রতিশ্রুতি।
নব্বইয়ের দশক থেকে স্থানীয় পর্যায়েও সেতুর দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। নাগরিক কমিটি, ব্যবসায়ী সমিতি, শিক্ষার্থী সংগঠন; সবাই বিভিন্ন সময়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। ২০০০ সালের পর দক্ষিণাঞ্চলের আঞ্চলিক সংযোগের প্রসঙ্গ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেতে শুরু করলে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিও নতুন মাত্রা পায়। বাস্তব অগ্রগতি আসে অনেক পরে।
২০১৩ সালে বরিশাল-ভোলা সড়কে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রথম শুরু হয়। পরে ২০২০ সালে আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। একই বছরের ৮ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বরিশাল-ভোলা সড়কে তেঁতুলিয়া ও কালাবদর নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন প্রস্তাবিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা।
নীতিগত অনুমোদনের পর প্রকল্পের অর্থায়ন, নকশা ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে পরবর্তী সময়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ আগের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা পুনরায় যাচাই করে এবং প্রকল্পের নকশা ও ব্যয়ের হিসাবও নতুন করে হয়। সেতু কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হালনাগাদ খসড়া প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পরিকল্পনা কমিশনে ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ-জাপান সরকারের পিপিপি প্ল্যাটফর্মের সপ্তম সভাতেও প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাবে প্রকল্পের পরিধিও বেড়েছে। বরিশাল-ভোলা সড়কে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর ১০ দশমিক ৮৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতু এবং ১৮ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। গত এপ্রিল মাসে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটি পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নে নীতিগত অনুমোদন দেয়।
তার মানে, ২০১৩ সালে প্রথম সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর আরও ১৩ বছর লেগে গেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ফিরতে। এর মধ্যে ভোলা-বরিশাল মহাসড়ক নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ নিঃসন্দেহে বড় আশার খবর। অতীতে যেভাবে দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পটি বারবার আটকে গেছে, এর পুনরাবৃত্তি আমরা আর দেখতে চাই না। ভোলার মানুষ এবার সেতুর দুঃখ ভুলতে চায়।
শতরূপা দে: যোগাযোগবিদ
- বিষয় :
- উন্নয়ন