ঐতিহ্য
প্রত্ন-পর্যটনের উন্নয়ন কৌশল
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চুয়ান্ন হাজার পাঁচশ এক বর্গমাইলের বাংলাদেশকে কেউ নিবিড়ভাবে দেখতে চাইলে প্রতি বর্গমাইলে একটা মাত্র দিন ব্যয় করলেও সময় লাগে ১৪৯ বৎসর। একটু বেশি এলাকা এক দিনে দেখতে চাইলেও পুরো দেশ দেখা সম্ভব নয় এক জনমে। তাই কেউ কেউ প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে ছোটেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। যতটুকু দেখা যায়, অতৃপ্তি থাকলেও তাতেই সমাপ্তি টানতে হয়।
নেই নেই করেও আমাদের দেশে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাড়ি আছে। কোথায়ও তা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায়, কোথায়ও বেদখল হয়ে বেহাল কিংবা সরকারি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া রাজবাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারীরা নির্মমভাবে নিহত হন পাকিস্তানি ঘাতকদের হাতে। যুদ্ধের পর দৃষ্টিনন্দন এ বাড়িটি ব্যক্তিগত দখলে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করেন টাঙ্গাইলের ভূমিপুত্র ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নান। পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার করায় বাড়িটি শুধু বেদখল হওয়া থেকে রক্ষাই পায়নি, দারুণ যত্নে আছে। নাটক, সিনেমার শুটিং ছাড়াও কেউ চাইলে ভবনের রেস্টহাউস ভাড়ায় ব্যবহার করতে পারেন।
সরকারি অফিস হয়ে আছে বাংলাদেশের অনেক রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি। বাড়ির মান আর শান বুঝে কোথায়ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, তো কোথায়ও তহশিল অফিস। সেগুলোতে মানুষ চলাচল করে বলে বাদুড় বাসা বাঁধেনি। সুচিত্রা সেনের বাড়ি ছিল মাদ্রাসার আওতায়। সেটা এখন দখলমুক্ত হয়ে দর্শনীয় স্থান। সুচিত্রা সেনের স্মৃতিধন্য সেই বাড়িতে রাত কাটিয়ে কোনো পর্যটক নিজের জীবনও ধন্য মনে করতে পারেন।
হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমা যারা দেখেছেন তারা ঐ অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদে মোহাচ্ছন্ন না হয়ে পারেন না। তিতাস নদীর তীরে কী চমৎকার ঘাটের পাশে প্রাসাদ! ঘাটের বিশাল চওড়া সিঁড়ি অনেক ওপর থেকে নেমে গেছে নদীর পানিতে। সুযোগ পেলে পূর্ণিমা রাতে ওই সিঁড়িতে বসে তিতাসের জলে পা ডুবিয়ে রাত কাবার করে দিতে অনেকেই উৎসুক হবেন। সে প্রাসাদ বেদখল থেকে উদ্ধার করে বড়ই বেচইন অবস্থায় পড়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর। দখল ধরে রাখতে একজন আধিকারিককে পদায়ন করা হয়েছে প্রাসাদে। তিনি সেখানে থাকেন; রাঁধেন বাড়েন। বছর পাঁচেক আগে দেখেছিলাম যেন-বা নির্বাসনদণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি। নির্জন প্রাসাদে একা থাকতে থাকতে উবে গেছে তাঁর সমস্ত রোমান্টিকতা। তিনি তখন উদ্ধার পেতে হাতড়াচ্ছেন খড়কুটো।
একসময় ছুটিছাটায় আমাদের বেড়াতে যাওয়ার মানেই ছিল কেবল কুটুমবাড়ি যাওয়া। সে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে বিশাল মাত্রায়। এখন ট্যুরিজম বা পর্যটন অন্যতম আকর্ষণ। তেমনি শখ পূরণের আরও ঠাঁই হতে পারে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, পুঠিয়া রাজবাড়ি, তাজহাট জমিদারবাড়ি, রানী ভবানীর রাজবাড়ি, উত্তরা গণভবন, মুক্তাগাছা রাজবাড়ি, শশী লজ, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি– এমনি আরও অনেক রাজবাড়ি-জমিদার বাড়ি। ইদানীং চালু হয়েছে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। বাড়িঘর বা কমিউনিটি সেন্টার ছেড়ে মানুষ বিয়ে করছে দূরের কোনো রিসোর্টে গিয়ে। পাত্র-পাত্রী দুই পক্ষেরই আত্মীয়স্বজন উপস্থিত থাকছেন সেখানে। প্রত্ন ভবনগুলোয় হয়তো রিসোর্টের মতো অত লোকের সংকুলান হবে না। তবুও ‘শখের তোলা আশি টাকা’। পরিবেশ তৈরি হলে এসব প্রাচীন ঐতিহাসিক ভবনে ডেস্টিনেশন বিয়ে বা নানান পারিবারিক কিংবা ব্যবসায়িক ট্যুরের জন্য উদগ্রীব হবে মানুষ।
আমাদের দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে আছে বেহুলা- লখিন্দরের বাসরঘর। হয়তো সত্যি; হয়তো সত্যি নয়। পশ্চিম বাংলার বর্ধমানের দামোদর তীরে মল্লসারুল গ্রামেও একই বর-কনের বাসরঘর থাকার জনশ্রুতি আছে। তবুও আকুল পর্যটকরা সহস্র টাকা খরচ করে বগুড়ার গোকুল গিয়ে হতাশ হন। অথচ একটু যত্ন নিয়ে গোকুলে বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘরকে যদি নববিবাহিতদের বাসরঘর হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে সংস্কার করা হয়; সেই সম্পূর্ণ আদিম মোড়কে, আমি নিশ্চিত– ওই বাসরঘরের বুকিং পেতে কোনো দম্পতি বিয়ে দীর্ঘদিন পিছিয়ে দিতেও রাজি হবেন। তাতে প্রত্ন পর্যটনে শুরু হবে এক নতুন উন্মাদনা। প্রয়োজন শুধু সুবিধাগুলো একটু হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া।
একবার সিকিমের উত্তরে ইয়ামথাং ভ্যালিতে এক রাত্রিতে থেকেছিলাম এক হেরিটেজ হোটেলে। চোগিয়াল আমলের প্রাসাদ। বাহির থেকে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ। ভেতরে ঢুকলে মনে হলো, এই বুঝি মহামান্য চোগিয়াল বা রাজকীয় পরিবারের কারও সামনে পড়ে যাই। পুরো প্রাসাদ সেই চোগিয়াল আমলের ছবি দিয়ে ভরপুর। রাজকীয় বিছানা। তবে সিকিমের উত্তরের দিকে বিধায় রুম হিটার আর গায়ের ওপরের লেপ-কম্বল ওই ঠান্ডা মানে না। মনে হলো, শুয়ে আছি ভেজা কাপড়ের ভেতর। যত ঠান্ডাই লাগুক, ওই প্রাসাদে রাত্রিযাপনের স্মৃতি এখনও বেজায় উষ্ণ।
প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের যে বাজেট, তাতে প্রত্ন স্থাপনাগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। প্রত্ন সম্পদের পরিচর্যা সাধারণ স্থাপনা পরিচর্যার মতো সহজ নয়। এ কাজ খুবই নিবিড় পরিচর্যায় বিশেষায়িতভাবে সম্পন্ন করতে হয়। তার জন্য যে টাকার দরকার; অনেক সময় বরাদ্দই হয় না। স্থাপনাগুলো পর্যটকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে যে আয় হবে তা দিয়ে পরিচর্যা করা যাবে। এ ছাড়া স্থাপনাগুলোয় লোকজনের সাময়িক বসবাস হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় ঝাড়পোঁছ হবে। তাতে স্থাপনাগুলো যথেষ্ট সতেজ থাকবে। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। সর্বোপরি দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ঘটবে অধিকতর।
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত
অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী