অন্যদৃষ্টি
সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনা
কাজী বোরহান উদ্দিন
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বে মানবসৃষ্ট ও প্রতিরোধযোগ্য সংকটগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম, যা প্রতিদিন অসংখ্য জীবন কেড়ে নিচ্ছে ও নিঃস্ব করছে অনেক পরিবারকে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।
২০২৫ সালের বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যমতে, সারাদেশে ৬,৬৫২টি দুর্ঘটনায় ৫,০৬৭ জনের মৃত্যু এবং ৬,৩১৯ জন আহত হয়েছে; যদিও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলেছে, ওই বছরে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৭,৩৫৯ জন এবং আহত ১৬,৪৭৬ জন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের মধ্যে গরমিল অনেক, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এ সংক্রান্ত পলিসি নির্ধারণেও।
১৯৯৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বিআরটিএর কাছে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য রয়েছে। তাদের তথ্যের উল্লেখযোগ্য উৎস পুলিশ ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী/চালক/যাত্রীদের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমেও তারা তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে। ২০২৩ সাল থেকে বিআরটিএ এ বিষয়ে মাসিক প্রতিবেদন নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের একই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি অত্যন্ত কাঠামোবদ্ধ। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। অনেক সময় ভুক্তভোগী কর্তৃক মামলা, সাধারণ ডায়েরি কিংবা অভিযোগ দায়ের করার সময়ও তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।
তবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট নানাবিধ প্রকল্পের আওতায় সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজ করে থাকে। যার প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এগুলো প্রকল্প মেয়াদকালীন, তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয় এবং জাতীয় পরিকল্পনায় ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পৃথকভাবে কোনো দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা নিতে আসা রোগীদের সাধারণ তথ্য থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য তারা সংকলন করে।
যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে, তাদের তথ্যের প্রধান উৎস দৈনিক সংবাদপত্র। তবে অপ্রকাশিত দুর্ঘটনা, মৃত্যু এবং আহত হওয়ার অনেক তথ্য আড়ালেই থেকে যায়।
একেক সংস্থার একেক রকম সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্যের পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ:
১. দেশে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো নির্দিষ্ট একক জাতীয় প্রতিষ্ঠান নেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিক্ষিপ্তভাবে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে থাকে।
২. সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমাধ্যমে যারা সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে, তাদের একটি একক তথ্যভান্ডার (ডেটাবেজ) নেই।
৩. সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংজ্ঞায় তারতম্য রয়েছে। এহেন দুর্ঘটনায় আঘাতজনিত কারণে কত দিনের মধ্যে বা কোন স্থানে মৃত্যু হলে সেটি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসেবে গণ্য হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই।
৪. দেশে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত।
৫. সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষিত লোকবলের সংকট রয়েছে।
এগুলো সমাধান করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনার গুণগত মানসম্পন্ন তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে, যা ব্যবহার করে সড়ক নিরাপত্তার কৌশলগত যৌক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ সম্ভব হবে। এরূপ যৌক্তিক পরিকল্পনা আমাদের ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আশা করা যায়, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেবে।
কাজী বোরহান উদ্দিন: প্রকল্প ব্যবস্থাপক (রোড সেফটি) সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি