ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকার দাম কমালেও সুফল পাচ্ছে না সুনামগঞ্জবাসী

সরকার দাম কমালেও সুফল  পাচ্ছে না সুনামগঞ্জবাসী
×

 সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমার নজির বেশ কম। এর মধ্যে সরকার জরুরি কোনো পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নিলেও সাধারণ মানুষ সাধারণত তার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়–অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর সুফল চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে। সর্বশেষ গত বুধবার জনসাধারণের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি এলপিজির (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) দাম সরকার কমালেও তার সুফল পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা।

রোববার সুনামগঞ্জ শহর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ঠিক আগের চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। অথচ সরকার প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১ টাকা ৩ পয়সা কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৩২ টাকা ১২ পয়সা অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ১ টাকা ৩ পয়সা কমানো হয়। এতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৯৮ থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন দামে আগস্টের তুলনায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমেছে। গত মাসে এর দাম নির্ধারিত হয়েছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা।

তবে সুনামগঞ্জের বাজারে এর কোনো সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হওয়ায় নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনে অতিষ্ঠ ভোক্তারা।
ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস কেনার পর পরিবহন, দোকান খরচসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে কেউ কেউ নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। আবার গ্রামের কোনো কোনো এলাকায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
নবীনগরের বাসিন্দা সবুজ বর্মণ মধ্যবাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার গ্যাসের দাম কমিয়েছে। অথচ বাজারে এক দোকানের সঙ্গে আরেক দোকানের দামের কোনো মিল নেই। দুই-তিনটি দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হয়েছে। সরকারের নির্ধারিত দাম যদি ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হয়, তবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ কী–তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা উচিত।
রামজীবনের বাসিন্দা সজীব আহমেদ বলেন, গ্যাসের দাম কমলেও দোকান থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকার নিচে গ্যাস কেনা যাচ্ছে না। দাম বেশি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে দোকানিরা বলছেন, এগুলো পুরোনো সিলিন্ডার এবং বেশি দামে কেনা। 

মধ্যবাজারের খুচরা গ্যাস ব্যবসায়ী তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, একেক সময় একেক দামে গ্যাস বিক্রি করতে হয়। ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস কিনে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করি। বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছি।
গ্যাস সিলিন্ডার কেনাবেচার মেমো বা ক্যাশমেমো দেওয়া হয় কিনা–জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে ডিলারের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার পর মেমো চাইলে তা দেওয়া হয়নি। উল্টো বলা হয়েছে, মেমো দেওয়া যাবে না–গ্যাস নিলে নেন, না নিলে নাই। 
এদিকে মধ্যবাজারে থাকা এলপি গ্যাসের ডিলার মেসার্স ফারজানা মেশিনারিজ-এর ম্যানেজার স্বাধীন জানান, সরকার নির্ধারিত দামে ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় গ্যাস বিক্রি করছি। বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত মাসের আগে ১২ কেজির গ্যাস ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এখন সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে। এলপি গ্যাস ক্রেতাদের মেমো না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। খুচরা বিক্রেতারা ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত ১২ কেজি সিলিন্ডারের গ্যাস বিক্রি করছেন। উপজেলার নতুনপাড়া এলাকার ব্রয়লার অ্যান্ড মুদি স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মেঘনা গ্রুপের ১২ কেজি ওজনের ফ্রেশ এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির কারণ জানতে চাইলে দোকানের মালিক লিটন আহমেদ দাবি করেন, তিনি প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে পাইকারি কিনছেন। ক্রয়ের কোনো ভাউচার বা চালান তিনি দেখাতে পারেননি। লিটন আহমেদের কাছে গ্যাস বিক্রি করা সুনামগঞ্জ শহরতলির রাধানগর পয়েন্ট এলাকার মেসার্স তাওহীদ গ্যাস হাউস নামের ডিলারের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, সেখানে থাকা মুসতাক আলী নামের একজন বলেন, ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার লিটন আহমেদের কাছে ১ হাজার ৫৬০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে। এই উপজেলার পলাশবাজারের রফিক স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, একই কোম্পানির ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন দোকানের মালিক রফিকুল ইসলাম।
রফিকুল ইসলাম বলেন, তারা ডিলারের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডারে ১ হাজার ৫৭০ টাকা দরে কিনেছেন। এ সময় রফিক স্টোরে থাকা বিশ্বম্ভরপুরের গ্যাস ডিলার ভাই ভাই গ্যাস-এর মো. সুমন মিয়া বলেন, কোম্পানি যে দরে তাঁদের কাছে গ্যাস সরবরাহ করছে, সেই অনুযায়ী তাঁরা বিক্রি করছেন। খুচরা দোকানদাররা তাহলে কত দামে গ্যাস বিক্রি করবেন–এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন মিয়া বলেন, তাঁরা ১ হাজার ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করবেন।

জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম মাসুদ বলেন, এলপি গ্যাস বিক্রি করতে হলে সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। ভাউচার না দেওয়াসহ বেশি দামে বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে শিগগির অভিযান পরিচালনা করা হবে।

আরও পড়ুন

×