ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিপদের ঋণ এখন ফাঁদ, সুদের ভয়ে আতঙ্কে ৫০ শিক্ষক

বিপদের ঋণ এখন ফাঁদ, সুদের  ভয়ে আতঙ্কে ৫০ শিক্ষক
×

মাজহারুল আলম মিলন, পীরগঞ্জ (রংপুর) 

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিপদের সময়ে সাময়িক স্বস্তির আশায় ঋণ নিয়েছিলেন পীরগঞ্জের কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা। সেই ঋণ এখন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ দেওয়ার সময় জমা নেওয়া ফাঁকা চেক ব্যবহার করে জালিয়াতি, চড়া সুদ আদায়, জমি লিখে নেওয়া, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত চেকে মোটা অঙ্কের ভুয়া টাকা বসিয়ে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক দাদন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। তাঁর এই সুদের জালে আটকা পড়ে বিপর্যস্ত ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগের তীর উপজেলার চতরা ইউনিয়নের নাদনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জিয়ার বিরুদ্ধে। জিয়া চতরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি পীরগঞ্জজুড়ে এক বিশাল দাদন সাম্রাজ্য ও সুদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ থেকে জানা গেছে, জিয়াউর রহমান ঋণগ্রহীতাদের জিম্মি করে ব্যাংক হিসাবের খালি চেকে স্বাক্ষর এবং টিপসইসংবলিত সাদা স্ট্যাম্প জমা রেখে ঋণ দেন। আসল ঋণ ও চড়া সুদ পরিশোধের পর সে চেক ও স্ট্যাম্প ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা না করে নানা বাহানা তৈরি করতেন। পরে ফাঁকা চেকে ইচ্ছামতো কয়েক গুণ বেশি অঙ্কের টাকা বসিয়ে ব্যাংকে ডিজঅনার করাতেন। এরপর ভুক্তভোগীদের নামে আদালতে চেক ডিজঅনার বা সিআর মামলা ঠুকে দিতেন। মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে ঋণগ্রহীতা পরিবারগুলোর সম্পত্তি গ্রাস ও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জাল বিছানো হতো।
চতরা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রয়াত সতীশ চন্দ্র সংসারে অর্থসংকটের কারণে জিয়ার কাছ থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণ নেন। বিপরীতে জামানত হিসেবে ব্যাংকের একটি ফাঁকা চেক জমা দেন। স্বজনদের দাবি, চার বছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা সুদে-আসলে পরিশোধ করার পরও হিসাব মেলানো হয়নি। উল্টো সুদের বকেয়া দেখিয়ে ২০ শতক জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়। প্রায় দুই বছর আগে তিনি মারা যান। মৃত্যুর পরও রেহাই মেলেনি; তাঁর জমা রাখা ফাঁকা চেকে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বসিয়ে মামলা করে দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে পরিবারটি পরে আরও দুই লাখ টাকা দিয়ে স্থানীয়ভাবে রফা করে।
অনুরূপ জালিয়াতির শিকার হয়েছেন বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহফুজার রহমান। তিনি দুই লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার পর ফাঁকা চেক ও কাগজপত্র জমা দেন। পরে তাঁর অজান্তে সোনালী ব্যাংক চতরা শাখা থেকে ৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠে জিয়ার বিরুদ্ধে। একই বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেন জানান, তিনি দুই লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে আট লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর দেনা শোধ হয়নি। উল্টো তাঁর ও তাঁর ছেলে এবং দুই ভাইয়ের নামে চেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৪০ লাখ টাকার আলাদা আলাদা ডিজঅনার মামলা দেন ওই ব্যবসায়ী।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান সরলিয়া টিএম ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানী। তিন লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে চার লাখ টাকা সুদ দেওয়ার পরও তাঁর নামে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মামলা দেওয়া হয়। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ব্যাংক থেকে জোর করে তুলে নিয়ে জিয়ার নিজ দোকানে রেখে নির্মমভাবে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতে বিচার চেয়ে মামলা করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, ফাঁকা চেকের বিনিময়ে টাকা ধার দিয়ে জিয়ার চক্রটি ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষকের নামে ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকার মিথ্যা চেকে মামলা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে। স্থানীয় বাসিন্দা জোনাফ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের পরও চেক ফেরত পাওয়া যায় না। যেকোনো সময় নতুন মামলার ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে জিয়াউর রহমান জিয়ার মুখোমুখি হলে তিনি সুদের ব্যবসার কথা অস্বীকার করেন। ক্যামেরার সামনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতেও রাজি হননি। একপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবেদকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং চড়াও হন।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমুল হক বলেন, ‘সুদের ব্যবসা ও ফাঁকা চেক দিয়ে হয়রানির বিষয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, ব্যক্তিগত ঋণ বা চেক জালিয়াতির মামলায় সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র নিয়ে ভুক্তভোগীরা এলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×