মেঘনায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ
আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘দিন-রাত নদীতে জাল ফেলে তেমন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না; যা মিলছে তা দিয়ে নৌকার তেলের খরচ উঠছে না। এখন ভরা মৌসুম। তারপরও নদীতে ইলিশ নেই বললে চলে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলেও অনেক সময় খালি ডালা নিয়ে ফিরতে হয়। মাছ না পেলে দাদনের টাকা শোধ করব কীভাবে, আর সংসারই বা কীভাবে চলবে?’
মেঘনা নদীর তীরে বসে কথাগুলো বলছিলেন জেলে গিয়াস উদ্দিন। তিনি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর মতো উপকূলের অনেক জেলেরই এখন এক অবস্থা। ভরা মৌসুমেও নদী-সাগরে জাল ফেলে আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না তারা। এতে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম। সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।
মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলার বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। নদী-সাগরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার হাজার জেলে। বর্ষা মৌসুমে মেঘনায় ইলিশ আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে ওঠে উপকূলের মাছঘাট, আড়ত ও বাজার। এবার সেই চেনা দৃশ্য নেই।
জেলা মৎস্য অফিসের সরকারি তালিকা অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীনির্ভর জেলে রয়েছেন ৩৬ হাজারের বেশি। তবে স্থানীয়দের হিসাবে নদী ও মাছের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল জেলের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। মেঘনা নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে তাদের জীবন-জীবিকা। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে ইলিশ আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এসব জেলে। বর্ষা শুরু হলে সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে আসবে– এমন প্রত্যাশায় নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদীতে নামেন তারা।
মাছের ওপর নির্ভর করে রায়পুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে ১৫ থেকে ২০টি মাছের আড়ত। এসব আড়তকে ঘিরে নদীর তীরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০টি বরফকল বা আইস ফ্যাক্টরি। মজুচৌধুরীর হাট, রামগতির গজারিয়া, বয়ারচর, চর আবদুল্লাহ, তেলিরচর, আলেকজান্ডার, রায়পুরের জালিয়ার চর, পানিরঘাটসহ বিভিন্ন মাছঘাটে রয়েছে এই মৎস্য অর্থনীতির বিস্তৃতি। মাছের সংকট দেখা দেওয়ায় এসব জায়গায় কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েছে।
জেলে আরছব মোল্লা বলেন, ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বাজার-সদাই নিয়ে নদীতে গেলে অনেক সময় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এতে খরচ তো ওঠেই না, উল্টো লোকসান হয়। এভাবে চলতে থাকলে জেলেদের পক্ষে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রামগতি মাছঘাটের ব্যবসায়ী মিনাজ মাঝি বলেন, গত বছর এই সময়ে তাদের ঘাট থেকে প্রায় ২০০ টন ইলিশ দেশের বিভিন্ন বাজারে গেছে। এ বছর মাছই পাওয়া যাচ্ছে না। জেলে রমিজল মাঝি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার মাছের পরিমাণ অনেক কম। অথচ জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। মাছ কম পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জেলেরা বলছেন, নাব্য সংকট, দূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
এদিকে ইলিশ কম পাওয়ায় শুধু জেলেরা নন, সংকটে পড়েছেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আড়তে আগের মতো মাছের সমাগম নেই। ব্যবসায়ীদের কেনাবেচাও কমেছে। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম।
মাছ বিক্রেতা তাজল ইসলাম বলেন, সাধারণত এ সময়ে ভরপুর ইলিশ থাকে। জেলেরা ট্রলারভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে আসেন। এবার জেলেদের অনেকের মাছ বিক্রি করে ডিজেলের খরচ পর্যন্ত উঠছে না। ফলে বাজারেও মাছের সরবরাহ কম। আড়তদার তাফাজ্জল ইসলাম বলেন, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আড়তদাররাও সমস্যায় পড়েছেন।
সরবরাহ কম থাকায় একদিকে যেমন ইলিশের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাকেও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। স্থানীয় ক্রেতা সেরাজ আলী বলেন, বর্তমান বাজারে ইলিশের দাম কিছুটা বেশি। তবে মেঘনা নদীর টাটকা ইলিশের স্বাদ আলাদা হওয়ায় দাম বেশি হলেও মানুষ মাছ কিনছেন।
স্থানীয় বাজার ও মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ কম থাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ইলিশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা কেজি দরে। ছোট আকারের ইলিশের দাম পড়ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। এছাড়া রুই ও কাতলা মাছ আকারভেদে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং সিলভার ও ব্রিগেড মাছ ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে নদী ও সাগরে ইলিশের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছিল। তখন অনেক জেলে নদী ও সাগরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে ভাটার কারণে ইলিশের বিচরণ কিছুটা কমেছে। আবার জোয়ার শুরু হলে ইলিশের পরিমাণ বাড়তে পারে।
- বিষয় :
- মাছ