ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেরপুরের নালিতাবাড়ী

বৃদ্ধার চোখে বন হারানোর বেদনা

বৃদ্ধার চোখে বন হারানোর বেদনা
×

পাহাড়ে তাকিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন সুনিলা ম্রং। নালিতাবাড়ী গারো পাহাড়ের কাটাবাড়ী এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা -সমকাল

মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে সুনিলা ম্রংয়ের শরীর। চোখে আগের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি নেই। হাঁটতেও কষ্ট হয়। কিন্তু গারো পাহাড়ের পুরোনো দিনের কথা উঠতে যেন বদলে যায় তাঁর অভিব্যক্তি। স্মৃতির পাতায় ফিরে আসে সেই পাহাড়, যেখানে ঘন বন ছিল, ছিল নির্জন পথ, বন্যপ্রাণীর বিচরণ। মানুষের বসতিও ছিল কম।

নালিতাবাড়ী উপজেলার কাটাবাড়ী এলাকার এই বৃদ্ধার স্মৃতিতে পাঁচ দশকের গারো পাহাড় যেন দুটি আলাদা চিত্র। একটিতে সবুজে ঢাকা পাহাড়, কম মানুষ আর প্রকৃতিনির্ভর জীবন। অন্যটিতে রাস্তা, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, দোকানপাট, পর্যটনকেন্দ্র ও প্রযুক্তির বিস্তার। সুনিলা ম্রং বলেন, ‘পাহাড় তখন অনেক বেশি সবুজ ছিল। এত ঘরবাড়ি ছিল না।’ এই একটি বাক্যে যেন ধরা পড়ে গারো পাহাড়ের পরিবর্তনের গল্প।
সুনিলা ম্রংয়ের ভাষ্য, ছোটবেলায় তাদের গ্রামে মাত্র তিনটি বাড়ি ছিল। পাহাড়ের দিকে তাকালে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত গাছপালা। এখন সেখানে বেড়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তা ও দোকানপাট।
একই এলাকার ষাটোর্ধ্ব সুলিতা ম্রংও দেখেছেন এই পরিবর্তন। তাঁর স্মৃতিতে, একসময় পাহাড়ঘেঁষা মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হতো। বর্ষায় কাদা আর শীতে ধুলা ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন পাকা সড়ক হয়েছে। মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক চলছে। ঘরে ঘরে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, মানুষের জীবনেও এসেছে স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু উন্নয়নের এই গল্পের অন্য পাশে রয়েছে বন হারানোর বেদনা।

বন কমে সংকুচিত প্রাণীর আবাস
একসময় গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা শাল-গজারি বনে ঢাকা ছিল। শাল, গজারি, অর্জুন, বহেড়া, হরীতকীসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গাছপালা ছিল বনের সম্পদ। লতাগুল্ম ও বিভিন্ন উদ্ভিদে সমৃদ্ধ সেই বন ছিল বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের জায়গা। সময়ের সঙ্গে গাছ কাটার পাশাপাশি বনভূমিতে বসতি ও কৃষিকাজ বেড়েছে। কোথাও তৈরি হয়েছে রাস্তা, কোথাও গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। ফলে বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে।
গারো পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যেও বন ও পাহাড়ের এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য মূল আকর্ষণ। মধুটিলা, গজনী ইকোপার্কও বনভূমি ঘিরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই বন বিভিন্ন জায়গায় দখল ও অব্যবস্থাপনায় সংকুচিত হচ্ছে।

নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় বন বিভাগের প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, এর প্রায় দুই হাজার একর দখল হয়ে গেছে। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই হাজার ঘরবাড়ি। বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল করে কৃষিকাজ ও বাগান করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়েও বাস্তবে দখল হওয়া বনভূমির পরিমাণ বেশি। দখল হওয়া জমিতে যখন স্থায়ী ঘরবাড়ি গড়ে ওঠে, তখন তা উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি জমি দখলের পর সেটি শুধু একটি পরিবারের বসতি হয়ে থাকে না; ধীরে ধীরে সেখানে তৈরি হয় রাস্তা, দোকান, কৃষিজমি কিংবা নতুন বসতি। এভাবে বনভূমি হারানোর প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বন কমলে হাতির পথও কমে
গারো পাহাড়ে বন সংকোচনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে বন্যহাতি ও মানুষের সম্পর্কের ওপর। আগে হাতিকে পাহাড়ের বন্যপ্রাণী হিসেবে দেখতেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখন জনবসতি বিস্তৃত হওয়ায় হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকলে শুরু হয় সংঘাত। নষ্ট হয় ধানক্ষেত, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি। কখনও প্রাণহানিও ঘটে। সুনিলা ম্রং জানান, আগে হাতি ছিল পাহাড়ের দিকে, এখন মানুষের বাড়ির কাছে আসে।

হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো জীবনধারা
পরিবর্তন শুধু বন আর পাহাড়ে নয়; বদলে গেছে মানুষের সামাজিক জীবনও। একসময় সন্ধ্যা নামলে বাড়ির উঠানে বসে গল্প করত মানুষ। বয়স্করা বলতেন পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণীর গল্প। শিশুরা শুনত। লোককথা মুখে মুখে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ত। এখন সেই জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন। সুনিলা ম্রং আক্ষেপ করে বলেন, আগে গল্প শুনতেন মানুষের মুখে। এখন গল্প দেখেন মোবাইল ফোনে।

চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ উদ্ধার
স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রায় প্রতিবছর দখল হওয়া বনভূমির তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু তালিকা তৈরি ও চিঠি চালাচালির বাইরে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে একদিকে দখলদার বাড়ছে, অন্যদিকে উদ্ধার কার্যক্রম থাকছে সীমিত।
বন বিভাগ বলছে, তারা বসে নেই। শ্রীবরদীর বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া এবং কর্মকর্তা আব্দুল করিম জানান, গত এক বছরে তাদের দুই রেঞ্জে প্রায় ১৫০ একর বনভূমি উদ্ধার করে বাগান করা হয়েছে। তাদের দাবি, বনভূমি উদ্ধারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সদিচ্ছার অভাব বড় প্রতিবন্ধকতা। বনভূমি উদ্ধারে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা দেওয়ান আলী জানান, গত এক বছরে তাঁর রেঞ্জে কোনো বনভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শেরপুরের সহকারী বন সংরক্ষক সাদেকুল ইসলাম খান বলেন, দখলদারদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ মামলা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত তাদের বিরুদ্ধে অভিযানও চলছে।

আরও পড়ুন

×