ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছাত্রী হল

নিরাপত্তা সমস্যার দায় শুধু নারীর?

নিরাপত্তা সমস্যার দায় শুধু নারীর?
×

আইরিন সুলতানা

আইরিন সুলতানা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সেকালে একবার প্রাচ্যের অক্সফোর্ডতুল্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর সান্ধ্য আইন চেপে বসল। তখনও টিউশন ও আয়রোজগার আসে এমন কাজ করতেন ছাত্রীরা। সান্ধ্য আইন তাদের স্বাবলম্বিতায় দেয়াল তুলে দিল। ছাত্রীরা উঁচু স্বরে বলেছিলেন– সান্ধ্য আইন মানি না।     

তখন মিম-ট্রল নয়; কার্টুন-ক্যারিকেচার হতো। সান্ধ্য আইন অমান্যকারী ছাত্রীদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র ছেপে দিল কাটতিওয়ালা পত্রিকা– সন্ধ্যারাতে মেয়েদের হলের বাইরে লকলকে জিভের লালা ঝরাচ্ছে এক দল কুকুর। অর্থাৎ পুরুষ গিজগিজ করা শহরে রাত করে হলে ফিরতে চাওয়া ছাত্রীরা একেকজন চরিত্রহীনা।     

আমেরিকাতেও ছাত্রীরা সান্ধ্য আইনের মুখে পড়েছিলেন। ষাটের দশক থেকে সেসব শিথিল হলো।  ১৯৭২ সালে আসে ফেডারেল নাগরিক অধিকার আইন ‘টাইটেল নাইন’। এই আইন সরকারি অর্থায়ন পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে দেয়। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস দিচ্ছে। সেখানে নীতি পুলিশিং চলে না। বরং টহল পুলিশ গোটা ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়। রাতে একা ছাত্র বা ছাত্রী চাইলে তাঁকে সঙ্গে করে ডরমিটরিতে পৌঁছে দেবেন নিরাপত্তাকর্মী। সব ক্যাম্পাসেই পর্যাপ্ত আলো থাকে। থাকে সিসিটিভির তদারকি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিক্ষার্থীরা স্মার্টকার্ড পাঞ্চ করে ক্যাম্পাস ও ভেতরের ভবনে আসা-যাওয়া করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীর জন্য আত্মরক্ষামূলক শরীরচর্চার প্রোগ্রাম ও মানসিক সহায়তা কেন্দ্র থাকে। ক্যাম্পাসগুলো বিশেষ হেল্পলাইন ও অ্যাপ সেবা দেয়, যেন ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে কোনো সমস্যায় ছাত্রছাত্রী দ্রুত যোগাযোগ করতে পারেন।  শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে একজন শিক্ষার্থীকে সুরক্ষা দিতে ইউকেতে আরও আছে  ইকুয়ালিটি অ্যাক্ট-২০১০।     

ইউকে নারীর জন্য নিরাপদ পাবলিক বাস নিশ্চিত করছে। বাসে প্রশিক্ষিত চালক, পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে। আরও আছে রিয়াল টাইম ট্র্যাকিং এবং জরুরি অ্যালার্ট বাটন। ট্রেনগুলোতে যথেষ্ট আলো এবং জরুরি সহায়তা কেন্দ্র রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে রাতে বিশেষ শাটল বাস-ট্রেনও থাকে।        

এদিকে ২০১৯ সালে সান্ধ্য আইনে মোটে ১৫ মিনিট বাড়তি পেয়েছিলেন শাবিপ্রবির ছাত্রীরা– রাত ১০টার বদলে প্রবেশের সময়সীমা বেড়ে হলো সোয়া ১০টা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইবিতে ছাত্রছাত্রী উভয়ের ঘাড়েই চাপল সান্ধ্য আইন। ছাত্ররা রাত ১১টার মধ্যে ফিরতে পারবেন। ছাত্রীদের বাধ্যতামূলক ফিরতে হবে মাগরিবের আজানের ১৫ মিনিটের মধ্যে। একই বর্ষ, একই অনুষদ, একই বয়স হয়েও ছেলেটি পেলেন রাতে ফেরার স্বাধীনতা; মেয়েটিকে হন্তদন্ত হয়ে হলে ঢুকতে হবে।     

এমন নির্লজ্জ বৈষম্যচর্চার পেছনে কলকাঠি নাড়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। তিক্ত সত্য হচ্ছে, প্রত্যেক নারীর পরিবারের কারণেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ফুলেফেঁপে ওঠে। নারীর অধিকার হরণের প্রথম পাঠ হয় পরিবারেই। সন্ধ্যারাতে ঘরে ফেরা নারীর ব্যক্তিসত্তাকে আক্রমণ করে তারই পরিবার। এই অসদাচরণ স্পষ্টতই কন্যাসন্তানের সঙ্গে পরিবার ও সমাজের বেয়াদবি।      

২০২৬ সালেও ঢাবির ছাত্রীরা প্রতিবাদ করছে সান্ধ্য আইন বাতিল চেয়ে, যা মাসখানেক ধরে খবরের শিরোনামে আসছে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট সদলবলে সভা করে জানাল– হলের গেট বন্ধের সময় এক ঘণ্টা বেড়ে রাত ১১টা পর্যন্ত হবে। সুপারশপের ডিসকাউন্ট বিজ্ঞাপনের মতো এই ঘোষণা শুনলে বিদ্রোহী কবি নির্ঘাত বলে উঠতেন– ‘হা হা হা পায় যে হাসি।’ মহাকাশে ৯ মাস কাটিয়ে পৃথিবীতে ফেরেন সুনিতা উইলিয়ামস। ঢাবির ছাত্রী হলে মহাকাশ থেকে তাঁকে সন্ধ্যার আগেই হলে ঢুকতে হতো।     

বহু শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও কাজ করেন। মহড়া ও মঞ্চে শো শেষ হতে সন্ধ্যা পার হবেই। সেসব দিনে হলে ফেরার চিন্তায় ছাত্রীদের বারবার একে-ওকে তাগাদা দিতে হয়। একই সময়ে ছাত্রটি হলে ফেরার চিন্তামুক্ত থেকে বরং মনোযোগ দিচ্ছে কাজে। এভাবে ভাবনা জগতে আপত্তিকর বৈষম্য চাপাচ্ছে হল কর্তৃপক্ষ। বাইরের নিরাপত্তাহীনতা কন্যাশিশু, তরুণী, ছাত্রী, নারীর দোষ নয়। একজন কন্যাসন্তান পরিবারের কেনা সম্পত্তি নয়। কন্যাসন্তানটি একজন ব্যক্তি, নাগরিক, পৃথিবী ও সভ্যতার অংশীজন। পরিবার-সমাজ, হল কর্তৃপক্ষ এখানে বাধ্য কন্যাসন্তান ও ছাত্রীটির ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকারকে সম্মান দেখাতে। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উপর্যুপরি চিন্তিত হল কর্তৃপক্ষ, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কেন নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানে পুরুষের ওপরেই সান্ধ্য আইন জারি করছে না?      
গ্লোবাল ভিলেজ যুগে ছাত্রী হলে এসব পুরুষতান্ত্রিক সান্ধ্য আইন তামাদি করতে হবে। রাষ্ট্রকে চলতে হবে নাগরিকের অধিকারবোধের মর্যাদা নিশ্চিত সাপেক্ষে।

ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সেই সীমাবদ্ধতার জন্য করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত। প্রতিষ্ঠান নিজের সীমাবদ্ধতার নিরিখে কিছু বিধি আরোপ করতে পারে, তবে তাতে বৈষম্য থাকলে ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকারবোধ ক্ষুণ্ন করার ব্যাখ্যা, দুঃখ প্রকাশ, সংশোধন ও ক্ষতিপূরণের চর্চা আবশ্যক। পড়া, খাওয়া, ঘুমের শৃঙ্খলা মানতে ছাত্র ও ছাত্রী উভয়কেই সুনির্দিষ্ট সময়ে হলে ফেরায় উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ছাত্র অবাধ সময় পাবেন; ছাত্রী সান্ধ্য আইন বাতিলে যুগে যুগে মাথা ঠুকবেন; সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা ১৫ মিনিট-এক ঘণ্টা ভিক্ষা হিসেবে ছুড়ে দেবেন– এসব নারীবিদ্বেষমূলক অবমাননা, পুরুষতান্ত্রিক অপমানের সংস্কৃতি ও লিঙ্গবৈষম্যের দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকে। ছাত্রদেরও নিজের অবাধ স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নৈতিকতা দেখাতে হবে। সান্ধ্য আইনের বিরোধিতায় সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রীয় আইনের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ ছাত্রীকে সান্ধ্য আইন দেখিয়ে হলে ফিরতে বাধ্য করার জন্য কোনো সচেতন মানুষ ট্যাক্স দেয় না। 

আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×