ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

নৃ-মুখ

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিরসন হবে?

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিরসন হবে?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিতীয় দফায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে কিছুটা তোপের মুখে আছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় তিনি। অতি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সঙ্গে বন্যা নেমে আসে। সেসব স্থানে হাঁটু ও কোমরপানি পার হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। এরই মধ্যে ঘটে পদার্থবিদ্যার প্রশ্নপত্রের ভুল। ফাঁস হয় শিক্ষামন্ত্রীর এক অনানুষ্ঠানিক ফোনালাপ, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’র সঙ্গে তুলনা করেন। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষেপে যায় শিক্ষার্থীরা। তারা পথে নামে। শিক্ষামন্ত্রীকে ‘পরীক্ষামন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে দাবি করে তাঁর পদত্যাগ।

শেষমেশ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থামিয়ে পরীক্ষায় ফেরত গেছে সরকারি তরফ থেকে কয়েকটি ঘোষণার পর। কিন্তু সবকিছু মিলে সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন। প্রথমত, সরকার যে এই বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব একটা আমলে নেয়নি, তা বোঝা যাচ্ছে প্রবল দুর্যোগের মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া দেখে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে, তাকে হাঁটুপানি বা কোমরপানি পেরিয়ে যেতে হবে পরীক্ষাকেন্দ্রে, তখন যে আতঙ্ক তার মনে ভর করে, তা কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিতরূপে পরীক্ষা দেওয়া কঠিন। অনেকেই ভেজা কাপড়চোপড় নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। অনেকেরই ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে পানিতে। পরীক্ষার জন্য পড়াশোনার কোনো পরিবেশ বা অবস্থা ছিল না। এসব বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এক সপ্তাহ পরীক্ষা বন্ধ রাখা যেত। কিন্তু সেটি হয়নি। 

সন্দেহ নেই, শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারও কিছু অবকাশ আছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অটোপাসের প্রতি ঝোঁক দেখা গেছে। সম্ভবত এমনটা আবারও ঘটতে পারে– এ আশঙ্কা থেকে সাম্প্রতিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের কিছু দাবি অভিভাবকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আমাদের শিক্ষা বরাবরই নিছক সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নয়; সার্টিফিকেট পেতে চায়। তাই যেনতেনভাবে তাদের একটি সার্টিফিকেট দরকার। এ কারণে বারবার বিভিন্ন সময়ে দাবি আসে অটোপাসের। তবে এটাও বলার অপেক্ষায় রাখে না, ২০২৪-এর পর শিক্ষার্থীদের আচার-আচরণ এবং দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়িত করেছি সেটির প্রয়োগ, পরিসর সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি তৈরি না করেই। ফলে তাদের মতোই সবকিছু চলতে হবে– শিক্ষার্থীরা এ ধরনের দাবি তুলছে। 

কিন্তু প্রশ্ন ভুলের প্রসঙ্গটি সরকার যেভাবে সামাল দিতে চেষ্টা করল, তাও কি যথাযথ? প্রথমে তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা বোর্ড এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যাই দেয়নি। এ নিয়ে হইচই যখন বাড়ল তখন সরকার বলল, সেই প্রশ্নের যারা উত্তর করেছে তাদের সবাইকেই পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। কিন্তু যারা ভুল প্রশ্নের উত্তর অস্বাভাবিক হচ্ছে দেখে নিজের ভুল মনে করে বারবার তা শুদ্ধ করার চেষ্টা করল এবং তা করতে গিয়ে অনেকটা সময় নষ্ট করল; ফলে সময়াভাবে অন্য প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না, তাদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে? শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার এবং অন্যায্যতার জায়গা থেকেই যাচ্ছে। 

সবচেয়ে বড় বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টাই দেখা হয়েছে এক প্রকার ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে। যে কারণে প্রথমে বিষয়টি খুব একটা আমলে নেওয়া হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী বলে দিলেন, এই প্রশ্ন তাদের আমলে হয়নি। এটি আরও দুই বছর আগে তৈরি করা প্রশ্ন। তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয়, আওয়ামী লীগের তৈরি করা প্রশ্ন দিয়ে সরকার কেন পরীক্ষা নিল? আওয়ামী লীগ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে– গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার অব্যবহিত পর থেকে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি বলে আসছে। সেই আমলের প্রশ্ন দিয়ে কেন পরীক্ষা হবে? দ্বিতীয়ত, এত বড় পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা হলো না কেন? এটিও তো পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা, ছুটিসহ বেশ কিছু বিষয় ঠিক করা হয় আবহাওয়াকে কেন্দ্র করে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো সরকারের মধ্যে সেই সাবধানতা নেই? 

আমরা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেঁচে যাই এবং এটিই হয় আমাদের নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবির একমাত্র তরিকা। শিক্ষাব্যবস্থাও এ দোষারোপের অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত নয়। এ কারণেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাইরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা কিংবা তাদের বুঝিয়ে ঘরে ফেরানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো তাগাদা লক্ষ্য করা যায়নি। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে তাদের কোনো ধরনের দুঃখ প্রকাশ কিংবা খামতি স্বীকারের কোনো ধরনের ইচ্ছাও তো দেখা গেল না।
সব সরকারই জানে, তাদের যে কোনো ধরনের ভুলত্রুটি কিংবা অবহেলা রাজনীতির প্রতিপক্ষ গ্রুপ লুফে নেবে। কিন্তু অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে সব সময় সমস্যার সমাধান যে করা যায় না– তা আমাদের অভিজ্ঞতাই সাক্ষ্য দেয়। এর পরও এই কৌশলেই এড়িয়ে যাওয়া হয় কীভাবে ঘটনাগুলো ঘটছে সেটির তদন্ত। উপরন্তু কয়েকজনকে চাকরি থেকে সাময়িক অপসারণ করে উত্তেজনা হয়তো কিছুটা প্রশমিত করা যেতে পারে, কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান তো মিলেই না, বরং ফিরে ফিরে আসে। 

বাংলাদেশের মানুষ একেবারে আড়াআড়ি দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। তাই হয়তো মনে করা হয়, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অন্তত একটা অংশের মানুষ বিশ্বাস করবে। বাস্তবে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সমস্যাকে বড় করে; মূল কারণকে আড়াল করে। এমনকি রাজনৈতিক ফায়দার চেয়ে বিষফোড়া হয়েও দেখা দিতে পারে। নিকট অতীতেই তার স্বাক্ষর আছে। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×