আবার গুমের অভিযোগ
দুঃশাসনের দুঃস্বপ্ন দূর হউক
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামক এক তরুণকে গুম করিবার যেই অভিযোগ কোস্টগার্ডের কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে উঠিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগীর পরিবারের ভাষ্য উদ্ধৃত করিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হইয়াছে, গত ১০ এপ্রিল সুন্দরবন হইতে বাড়ি প্রত্যাবর্তনের পর ঐ তরুণের মোবাইল ফোনে কয়েক দফা কল আসে। সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি হইতে বাহির হইয়া জয়মণি ঠোটা এলাকার চায়ের দোকানে পৌঁছাইলে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয় দানকারী সাদা পোশাকধারী দুই ব্যক্তি তাঁহাকে বোটে তুলিয়া লইয়া যান। ইহার পর হইতেই মিরাজ শেখ নিখোঁজ; মোবাইল ফোনও বন্ধ। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরিয়াও তাঁহার স্বজনরা হতাশ হইয়াছেন।
যাহা অধিকতর উদ্বেগজনক, একদিকে কোস্টগার্ড এই ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করিতেছে, অন্যদিকে পুলিশও তদন্তের নামে কার্যত সময়ক্ষেপণ করিয়া চলিয়াছে। ঘটনাটি এবং ঘটনাটি লইয়া সৃষ্ট অভিযোগ কেবল পরিবারবিশেষের জন্য উৎকণ্ঠামূলক নহে; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও উদ্বেগজনক।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর কতিপয় সদস্য কীভাবে গুমের ন্যায় ঘৃণ্য অপরাধে জড়িত হইয়া পড়িয়াছিল, আমরা জানি। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পতনের প্রেক্ষাপট তৈরীতেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখিয়াছিল ঐ সকল অঘটন। সেই কারণেই সম্ভবত গত দুই বৎসর এইরূপ ভয়ংকর তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া যায় নাই। গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যত প্রথম অভিযোগটি এমন সময়ে ঘটিল যখন বিগত আওয়ামী লীগ আমলে গুমের কারণে নেতাকর্মী হারানো রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতাসীন; দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও গুম-খুনের ন্যায় গুরুতর অপরাধের অবসান ঘটাইবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল। উপরন্তু বিগত আমলে সংঘটিত একাধিক গুমের ঘটনার বিচারও চলমান। কিন্তু বাগেরহাটের অভিযোগটি প্রমাণ করিল, গুমের ন্যায় অপরাধ সংঘটনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী জনগণের আস্থা অর্জনে সমর্থ হয় নাই। ভুক্তভোগীর পার্শ্বে দাঁড়াইবার ক্ষেত্রেও পুলিশের পূর্বতন অনীহা অক্ষুণ্ন রহিয়াছে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, অন্তর্বর্তী সরকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স তথা গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশকে পক্ষভুক্ত করিয়াছিল, যেইখানে গুম মানবতাবিরোধী অপরাধরূপে চিহ্নিত। সকল কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারণা স্বাভাবিক– গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার ন্যায় অপরাধ রোধে দেশে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হইতে চলিয়াছে। ইহা সত্য, গুম-সংক্রান্ত সনদটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের স্বার্থে নূতন আইন প্রণয়ন, তৎসহিত প্রচলিত আইনের পর্যালোচনাপূর্বক সংশোধন অদ্যাবধি সম্ভবপর হয় নাই। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্য বহু অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদনের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে পরিণত করিলেও বর্তমান সরকার গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে নাই। তদুপরি এই বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে যেই আইনটি প্রস্তাব করিয়াছে, তাহার দুর্বলতা লইয়া মানবাধিকার সংস্থাগুলির মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক করিয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে, প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হইবে এবং গুমের তদন্তভার পুলিশের হস্তেই রক্ষিত। এই আশঙ্কা অমূলক নহে, সরকার নিরাপত্তা বাহিনীগুলিকে জবাবদিহির আওতায় আনিতে ইচ্ছুক নহে।
আমরা বিশ্বাস করিতে চাহি, যেই সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার সমুন্নত রাখিবার অঙ্গীকার করিয়া ক্ষমতায় উপবিষ্ট, সেই সরকার গুমের ন্যায় জঘন্য অপরাধের প্রতি চক্ষু বন্ধ করিয়া রাখিবে না। গুমের আলোচ্য অভিযোগ লইয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বিবৃতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাসমূহের মধ্যে গুমের ন্যায় অপরাধ চর্চা গাঁথিয়া গিয়াছে বলিয়া যেই অভিযোগ তোলা হইয়াছে, অবিলম্বে উহা অমূলক প্রমাণ করিতে হইবে সরকারকেই।
আমরা মনে করি, গত ১২ জুলাই ভুক্তভোগীর পিতার করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি এবং ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজকে আদালতে হাজির করিবার যেই নির্দেশ দিয়াছেন, তাহা প্রতিপালনের মধ্য দিয়া নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার কাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়াটি সূচিত হইতে পারে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়