প্রতিবেশী
‘তেলাপোকা’ বিক্ষোভে অতিকায় হস্তীর বিপদ
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে– শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। ‘চলো সংসদ’ নামে প্রধানত অনলাইনভিত্তিক তরুণদের দলটির সোমবারের মাঠের কর্মসূচিতে প্রশ্ন ফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও তারা বিক্ষোভে হাজির হন। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমাতে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়; অনেককে গ্রেপ্তার করে। সংগত কারণে ভারতের তো বটেই, বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ককরোচ জনতা পার্টি এখন বড় খবর। দেশটির তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট যে প্রকট, সে বিষয়ে ককরোচ পার্টি যেভাবে কথা বলছে, তাতে অল্প সময়েই তারা তরুণ ও অন্যদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির সূচনাটা ব্যঙ্গাত্মকভাবে হলেও তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে– বলার অপেক্ষা রাখে না। দুই মাস আগে, ১৬ মে এ আন্দোলনের সূচনা। তার আগের দিন ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের মন্তব্যের প্রতিবাদ হিসেবেই দেশটির তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি অভিজিৎ দীপকে আন্দোলনের নাম ঘোষণা করেন। প্রধান বিচারপতি তরুণ প্রজন্মকে ককরোচ তথা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বেকার তরুণদের পরজীবী ও তেলাপোকা বলায় ভারতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ভারতীয় তরুণ অভিজিৎ দীপকে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (টুইটার) লিখেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে দল বাঁধে, তবে কেমন হবে?’ তাঁর এই পোস্ট দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরই তিনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে ওয়েবসাইট তৈরি করেন। ককরোচ পার্টি কেবল সামাজিক মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা পায়নি; বাস্তবেও ১০ লক্ষাধিক মানুষ ফরম পূরণ করে তাদের সদস্য হয়েছে। মাঠের কর্মসূচিতেও মানুষের ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
সিজেপি এখন আন্দোলন করছে শিক্ষার সংস্কার নিয়ে। ককরোচ জনতা পার্টি ডটকম নামে তাদের ওয়েবসাইটে গেলে শুরুতেই আসবে ‘ফাইভ ডিমান্ডস টু এন্ড ইন্ডিয়া’স এক্সাম ক্রাইসিস’। অর্থাৎ ভারতের পরীক্ষার সংকট সমাধানে ৫টি দাবি। সেগুলো হলো– নতুন পাবলিক পরীক্ষা আইন; জাতীয় পরীক্ষা গ্রহণের কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ; শিক্ষার্থীদের অধিকারের সনদ গ্রহণ; শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠন এবং পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে স্থায়ী সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করা।
ভারতে সম্প্রতি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। সরকার পরীক্ষাটি বাতিল করে নতুন ভর্তি নিলেও তরুণদের ক্ষোভ তাতে প্রমমিত হয়নি। ককরোচ পার্টি শিক্ষাব্যবস্থার ওই ব্যর্থতার দায় নিয়ে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে। তাদের দাবি, এ ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ভারতে ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ‘বিশৃঙ্খলাকারী শক্তির বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ককরোচ পার্টির আন্দোলনে ভারতের সচেতন নাগরিক সমাজের অনেকেই সমর্থন দিয়েছেন। ভারতের খ্যাতিমান শিক্ষা ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক তাদের দাবির সমর্থনে অনশনে বসেন। ২০ দিন অনশন করার পর শনিবার সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি অনশন ভাঙার জন্য তিনটি শর্ত দেন। সাম্প্রতিক প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ব্যর্থতার দায় সরকারকে স্বীকার করতে হবে। তাকে এবং ককরোচ পার্টির নেতারা সংসদে যাবেন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি সংসদ সদস্যরা সেখানে উত্থাপনের আশ্বাস দেবেন। অথবা সংসদ সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে একই ধরনের আশ্বাস দেবেন।
কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিলাসী’ গল্পে বলেছিলেন– ‘টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে’। ভারতে ককরোচ পার্টির আন্দোলন যখন সূচিত হয়, তখন অনেকে এটাকে সত্যিকার ‘তেলাপোকা’ সাব্যস্ত করে ধারণা করেছিলেন, এটা টিকে থাকলেও কায়ক্লেশে টিকে থাকবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তেলাপোকার দাপটে অতিকায় হস্তীও লোপ পেতে পারে কিনা, সেই আশা কিংবা আশঙ্কা প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল, যার পরিণতি সরকার পতন পর্যন্ত গড়ায়। ভারতের ককরোচ পার্টির আন্দোলন যেভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে, তাদের দাবি মেনে না নিলে ভারতেও বড় পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ
সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]