ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরবরাহের পর থেকেই বিকল সব সরঞ্জাম

সরবরাহের পর থেকেই বিকল সব সরঞ্জাম
×

নান্দাইলের পাচরুখী সাব-ডাকঘর জরাজীর্ণ হেমগঞ্জ বাজার শাখা ডাকঘরে অযত্নে পড়ে আছে সরঞ্জাম সমকাল

মজুমদার প্রবাল, নান্দাইল (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘পোস্ট-ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি’ প্রকল্পের আওতায় নান্দাইল উপজেলার ২২টি ডাকঘরে সরবরাহ করা সরঞ্জামাদি বিকল অবস্থায় পড়ে আছে, কোথাও কোথাও হদিসও নেই। দু-একটি ডাকঘর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে নামমাত্র টাকা জমা দিলেও বাকিগুলো দিচ্ছে না। এসব ডাকঘর কিশোরগঞ্জ জেলার আওতায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অর্থায়নে ২০১১ সালে শুরু হয় প্রকল্পটি। ২০১৭ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ডাকঘরগুলোর সেবাদান অব্যাহত থাকার কথা। কিন্তু নান্দাইলের ডাকঘরগুলোতে সেবাদান বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিম্নমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহে প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ২০১১ সালে ‘পোস্ট-ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি’ নামে একটি প্রকল্প চালু করে। এর আওতায় ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের পাঁচ হাজার ৮০০টি ডাকঘরে তিনটি করে ল্যাপটপ, একটি করে স্ক্যানার ও প্রিন্টার মেশিন, আটটি করে গদিওয়ালা চেয়ার, ১২ ওয়াটের দুটি ব্যাটারিসহ বেশ কয়েকটি সোলার প্যানেল সরবরাহ করা হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের মানুষের কাছে সহজে ডিজিটাল সেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক ভাতা বিতরণ, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তি এবং বিদেশে অবস্থানকারী স্বজনের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করার পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া।

নির্দেশনা ছিল প্রতিটি ডাকঘরের জন্য একজন উদ্যোক্তা নির্বাচন করবে এবং তাঁকে ডিজিটাল সরঞ্জামাদি বুঝিয়ে দেবে। প্রতি মাসে যা আয় করবেন, তার ৮০ শতাংশ নেবেন উদ্যোক্তা। বাকি ২০ শতাংশ স্থানীয় ডাকঘরকে দেবেন। স্থানীয় ডাকঘর ১০ শতাংশ রেখে বাকি ১০ শতাংশ উপজেলা ডাকঘরে জমা দেবে।
নান্দাইল উপজেলায় শাখা ও উপশাখা মিলে ২২টি ডাকঘর রয়েছে। ডাকঘরগুলো প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কয়েক মাস পরেই চাকরি নিয়ে অন্যত্র চলে যান অনেক উদ্যোক্তা। ফলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে দু-একটি ছাড়া বাকি কোনো ডাকঘরেই এ ধরনের সেবা ও সরঞ্জামের হদিস নেই। বার বার তাগাদা দেওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ বিকল যন্ত্রপাতি বুঝে নিচ্ছেন না। তাই কোথাও কোথাও অযত্নে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

হেমগঞ্জ বাজারে (ঝালুয়া) গিয়ে দেখা যায়, বাজারের একটি ছোট্ট একচালা আধাভাঙা টিনের ঘরে চলছে হেমগঞ্জ বাজার পরীক্ষামূলক ডাকঘরটি। ভেতরে অযত্নে পড়ে রয়েছে অকেজো সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি। পোস্টমাস্টার (ইডিডিএ) জিয়াউর রহমান জানান, এনামূল ইসলাম নামে এক উদ্যোক্তাকে দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল। পরে চাকরি হওয়াতে চলে গেছেন তিনি। এর পর বুলবুল নামে অন্য একজনকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় সব নষ্ট হয়ে গেছে বলে ফেরত দিয়ে গেছেন। অকেজো সরঞ্জাম ফেরত নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে বরাবর চিঠিও দিয়েছেন তিনি, কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছেন না।
গোসাই চান্দুরা পরীক্ষামূলক ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, বিনা ভাড়ায় একজনের বাড়ির একটি ঘরে থাকা ডাকঘরটি বন্ধ। অসুস্থ পোস্টমাস্টার আব্দুল খালেকের বাড়িতে গেলে তিনি জানান, উদ্যোক্তা চাকরিতে চলে যাওয়ার পর উৎসাহী আর কাউকে না পাওয়ায় ঘরে থেকেই সব নষ্ট হয়ে গেছে। 

কালেঙ্গা শাখা ডাকঘরে গেলে পোস্টমাস্টার দুলন মিয়া বলেন, তিনি নিজে উদ্যোক্তা হিসেবে কয়েক মাস ব্যবহার করে টাকাও জমা দিয়েছেন। এর পর থেকে দুর্বল জিনিস সব অকেজো হয়ে পড়েছে। 
পাঁচরুখী সাব-পোস্ট অফিসে দেখা যায়, ছাদে চারটি সোলার প্যানেল লাগানো। তবে সেগুলো অকেজো। পোস্টামাস্টার আব্দুর রউফ জানান, তাঁকে পরে দেওয়া হবে বলে তিনটির স্থলে একটি ল্যাপটপ দেওয়া হয়। তাঁর কাছে থাকা সব যন্ত্রপাতি এখন নষ্ট। কিছু ফেরত দিয়েছেন, কিছু বাকি রয়েছে। 
মোয়াজ্জেমপুর শাখা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ফারুক খানের ভাষ্য, তিনি সোলার প্যানেল পাননি। সরঞ্জাম দেওয়ার পর এক বছর কাজ করা হয়েছে, তখন টাকাও জমা দিয়েছেন। কিন্তু উদ্যোক্তা চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পড়ে থেকে সব বিকল হয়ে গেছে।
উলুহাটি ডাকঘরে গিয়ে জানা যায়, বর্তমান পোস্টমাস্টার রুবী কয়েক মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন। পোস্টমাস্টারের দায়িত্বে থাকা তাঁর স্বামী নুরুল আমিন ভূঁইয়া তরুন জানান, তিনি নিজেই উদ্যোক্তা হিসেবে এগুলো দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু নিম্নমানের জিনিসপত্র সরবরাহের কারণে বেশি দিন টেকেনি। জোড়াতালি দিয়ে একটি ল্যাপটপ ব্যবহার করে যাচ্ছেন বলে প্রতি মাসে কিছু টাকা জমাও দিচ্ছেন।

বারইগ্রাম পরীক্ষামূলক ডাকঘরের পোস্টমাস্টার তাহের উদ্দিন জানান, এক উদ্যোক্তা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তিন-চার মাস পরেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সরঞ্জাম ফেরত দিয়ে গেছেন উদ্যোক্তা।
গাঙ্গাইল শাখা ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা উদ্যোক্তা ইয়াসিনকে দিয়ে কিছুদিন কাজ করিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি মালপত্র তাদের বুঝিয়ে না দিয়েই বিদেশ চলে গেছেন। পোস্টমাস্টার মাসুদ মিয়া জানান, তাঁর অধীনে থাকা আটটি পরীক্ষামূলক ডাকঘরের মধ্যে উলুহাটী এবং চংভাদেড়া এখনও প্রতি মাসে কিছু টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছে।

সুন্দাইল পরীক্ষামূলক ডাকঘরের পিয়ন রবীন্দ্র দাস বলেন, সরঞ্জামদি পাওয়ার কিছু দিন পরেই নষ্ট হয়ে যায়। কিছু ফেরত দেওয়া হয়েছে, কিছু বাকি রয়ে গেছে।
নান্দাইল উপজেলা পোস্টামাস্টার গোলাম আজমের ভাষ্য, সরঞ্জামগুলো ছিল নিম্নমানের। ফলে সরবরাহের পরপরই নষ্ট হতে থাকে। বিকল যন্ত্রপাতি অনেকে ফেরত দিয়েছেন, কেউ কেউ আবার ফেরত দেননি। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি চালু করা হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি।
কিশোরগঞ্জ ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মিঠুন কুমার দাস বলেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা নয়। কোন কোন ডাকঘরে এমন হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে অভিযোগ দিলে তদন্ত করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

 

আরও পড়ুন

×